বিকেল খুব অদ্ভুত সময়। খুব যখন ছোট ছিলাম , বিকেল বেলা আম্মু আমাকে ঠেসে ধরে ঘুম পাড়াত। কোনদিন ঘুমাতাম, আর কোনদিন ঘুমের ভান করতাম। আমার নজর থাকত ঘড়ির কাটার দিকে। ৪-৫ টা বাজলেই আম্মুর পাশ থেকে উঠে পা টিপে টিপে ঘর থেকে পালানোর চেষ্টা করতাম। নিচে আমার বয়সী অনেক বাচ্চা, তাদের সাথে খেলতে নামব। শুক্রবার হলে বাংলা সিনেমা দেখে খেলতে নামতাম, মাথার মাঝে বাংলা সিনেমার ডায়লগ...বয়স তখন ৫-৬ হবে...
আরেকটু বড় হলে ঢাকা চলে আসলাম। মর্নিং শিফটের স্কুল, বিকেল বেলা অফুরন্ত অবসর। এইসময় হল গল্পের বইয়ের নেশা। পুরাটা বিকেল আমি আমাদের বাসার খোলা বারান্দায় বসে দুই পায়ে চেয়ার দাড় করিয়ে দোল খেতে খেতে গল্পের বই পড়ে পার করতাম। কখনও বইও পড়তাম না, বাইরে তাকিয়ে থাকতাম, রাস্তায় মানুষ যায়, তাদের দেখতাম। কোন কিছু না দেখেও কেমন করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে তাকিয়ে থাকা যায়, সেটা আমার চেয়ে ভাল কে জানে।
ক্লাস সিক্সে চলে আসলাম আইডিয়াল স্কুলে। ডে শিফটের স্কুল। বিকাল বলতে লাইফে আর কিছু থাকল না। আসলেই না। যেটা থাকল সেটা হল দুপুর। বিকাল তিনটায় নামাজের ব্রেকের পরে আমাদের ফোর্থ পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হত। বাইরে ঝা ঝা রোদ্দুর, কাক ডাকে। মতিঝিলের ব্যস্ত রাস্তাও ফাকা হয়ে আসে। রাস্তার ওপারে কলোনী দেখা যায়, বোর লাগলে আমরা কলোনীর বাসাগুলায় মানুষজন দেখতাম। এই দুপুরে সেখানেও আর কাউকে দেখা যেত না। স্বাভাবিকভাবেই আমার দুনিয়া ভেঙ্গে ঘুম আসত। কেউ বিশ্বাস করবে কি না জানি না, একবার পুরা ফোর্থ পিরিয়ড আমি ঘুমিয়ে পার করেছি।
ক্লাস এইটে বৃত্তি কোচিং এর সময় ক্লাস সকালে হত। বিকেলটা ছুটি। অবসর পেয়ে আমি আবার পুরোপুরি দার্শনিক হয়ে গেলাম। স্কুল থেকে এসে আমি সিসিমপুর দেখতাম। তারপর পুরা বিকেল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম, আর দিন-দুনিয়া-জীবন-পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করতাম। ভাবতাম আর ভাবতাম... এখনও ভাবি...
স্কুল শেষ করে কলেজ। ঢাকা কলেজ। সকালটা পার করতাম কলেজে। কোন কাজে সেটা কেউ জিজ্ঞেস করবেন না। তবে বিকেলটা বাসাতেই থাকতাম। হাতে তখন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কিছুদিন হল কিনেছি। জীবন বড় রঙিন লাগে । নতুন নতুন আড্ডা মারতে শিখেছি। কোন কাজ ছাড়া কেবল আড্ডা মারার জন্যও যে বাসা থেকে বের হওয়া যায়, এই জ্ঞান আমার পৃথিবী বদলে দিল। কলেজ লাইফের পুরাটা আমি আড্ডা মেরে অতি অতি অতি আনন্দের সাথে পার করেছি। নাহরে বাগিচার সেই আড্ডার স্মৃতি আমার মুখে এখনও হাসি ফোটায়।
কলেজের পর ভার্সিটি। অদ্ভুত একটা সময়। এতদিনে বই পড়ার অভ্যাস পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে, বিকেল হলে আমি ফেসবুকের সামনে বসে থাকি, নাহয় মুভি দেখি। জানালার বাইরে সুন্দর রোদ আসে, আমার জানালার পর্দা টানা থাকে। ঝা ঝা রোদ্দুর পার হয়ে একসময় রোদটা সোনালী হয়ে আসে, আমি খেয়ালও করি না। বাইরে চমৎকার নীল আকাশ, আমি মুভি দেখি। মুভি দেখতে দেখতে একটা সময় চোখ ব্যথা করে, মাথা ধরে যায়, আমি আরেকটা মুভি শুরু করি। একসময় চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করি। বাইরে তাকিয়ে দেখি, বিকেল গড়িয়ে সেই কখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আমি টেরও পাইনি...
১৯৯৭ সালের কথা। তখন অনেক ছোট। আব্বুর পোস্টিং মাদারীপুর। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে আমরা আয়োজন করে ঢাকা বেড়াতে আসি। একবার বাসে আসার সময় এক লোকের সাথে পরিচয় হল। লোকটার নাম অদ্ভুত, "সুপারভাইজার" । আব্বু বলল এই লোক নাকি বাসের সবকিছু তদারকি করে। যাত্রীদের কিছু সমস্যা আছে কি না, বাস কোথায় থামবে নানান হাবিজাবি। লোকটা নাকি খুব ভাল মানুষ, অতি সজ্জন। আব্বুর সাথে দেখলাম লোকটার বেশ খাতির।
সে যাই হোক, ঢাকায় বেড়াতে এসে একটা ব্যপার ঘটে গেল। আমি ঢাকা শহরের একটা নামকরা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে টিকে গেলাম। আব্বু আমাকে আর আম্মুকে ঢাকায় রেখে মাদারীপুর চলে গেল ঢাকায় পোস্টিং এর কিছু করা যায় কি না, সেটা দেখতে। বললেই ঢাকায় পোস্টিং হয় না। সময় লাগে। মা- ছেলে ঢাকায় থাকি, আব্বু সাত দিনে- দশ দিনে একবার ঢাকা আসে আমাদের দেখতে।
আব্বু আসার পরে আমরা আগ্রহ নিয়ে মাদারীপুরের খবরাখবর শুনি। একদিন শুনি সেই অতি ভালমানুষ সুপারভাইজার নাকি বাস অ্যাক্সিডেন্টে মরে গেছে। রাস্তার উপরে নাকি গরু উঠে পড়ছিল। সেই গরুকে সাইড দিতে গিয়ে বাস খাঁদে পড়ে , সুপারভাইজানের পেটের মধ্যে রড ঢুকে গেছিল।
গরু-ছাগলের চলার যায়গা রাস্তা না। তাও রাস্তায় উঠে পড়া একটা গরুকে সাইড দিতে গিয়ে সুপারভাইজানের মত মানুষ মারা যায়। একটা গরুর জন্যেও মানুষের কত মায়া, কত দরদ। আবার মাঝে মাঝে দেখি মানুষই আরেকজন মানুষের সুখ দুঃখের, ভাল-মন্দের ব্যপারে কত উদাসীন...
মেলে না, সব হিসেব মেলে না কোথাও...
১৯৯৮ সালের ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপ যখন চলে, আমি তখন গবর্ণমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ক্লাস ওয়ানের ছাত্র। তার আগের বছর আমি ছিলাম মাদারিপুরের কালকিনি কিশলয় কেজি বিদ্যানিকেতনের ছাত্র। ডিসেম্বর মাসে মাদারিপুর থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য ঢাকায় আসা। ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম দেখে আব্বুর শখ হল আমাকে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ানোর, আর আমাকে পড়ানোর দায়িত্ব পড়ল আম্মুর ঘাড়ে। আমার মনে আছে, ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ আমরা সিলেট থেকে ঢাকা ফিরি। এত আগের ঘটনার তারিখ মনে থাকার একটা কারন আছে, আমার পরিষ্কার মনে পড়ে, সিলেট থেকে আসার সময় বাস যখন একটা পেট্রোল পাম্পে দাঁড়ায়, আমি তখন বাংলাদেশের একটা পতাকা হাতে নিয়ে এরোপ্লেনের মত উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের কথা বলছি। এর দুই মাস আগে প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানা মারা গেছেন। আলনা টানেলের ভেতর এক্সিডেন্ট করেছিল উনার গাড়ি। গুগুল করে মনে করিনি, এমনকি নেটফ্লিক্সের ক্রাউন সিরিজ দেখেও মনে করিনি। আমার নামটা মনে আছে। ১৯৯৭ সাল থেকেই আছে। কেন আছে জানি না। মাদারিপুরের কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোয়ার্টারে থাকতাম। দোতলায়। দুপুর বেলা আব্বু বাসায় ফেরার সময় হাতে একটা পত্রিকা নিয়ে ফিরত। একদিন দুপুরে হাসপাতাল থেকে থেকে ফিরে গম্ভীর গলায় আমাকে বলল, প্রিন্সেস ডায়না মারা গেছে। আলনা টানেলের ভিতর গাড়ি এক্সিডেন্ট করছিল। মাথায় ঢুকে গেল আলনা টানেল। এর আগে আমি দুইটা আলনা চিনতাম। একটা হচ্ছে আমাদের রুমে কাপড় রাখার জিনিস। আরেকটা আমাদের হাতের হাড্ডি। আমার বাবা, আমি এখনো জানি না কেন, আমার সাথে বড় মানুষের মত আলাপ করত। বাবার কাছে আমি জানতে পারি, নার্সারি বা ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময়, যে মানুষের কনুইয়ের নিচে থেকে দুইটা হাড্ডি, একটা রেডিও , একটা আলনা। রেডিও মনে ছিল, কারন আব্বুর একটা লাল রঙের পকেট রেডিও ছিল, যেটার স্পিকারের কাছে ছিল একটু ভাঙ্গা। যেই রেডিওতে ১৯৯৭ এর আইসিসি ট্রফির ফাইনাল আমি কানের কাছে লাগিয়ে আব্বুকে শুনতে দেখেছি।
ডায়ানা ছাড়া আরেকটা মৃত্যুর খবরের কথা আমি মনে করতে পারি। ১৯৯৬ সালে সালমান শাহ মারা যান। আমি আব্বু-আম্মুর রুমের বারান্দায় খেলছিলাম। খেলা মানে আম্মুর সুতার গুটি থেকে লাল-নীল নানা রঙের সুতা কেচি দিয়ে কুচিকুচি করে কাটা। আব্বু দুপুরের দিকে বাইরে থেকে এসে গম্ভীর স্বরে বলল, সালমান শাহ মারা গেছেন। জানি না কেন, আমাকে বলার মত এত জরুরী খবর কেন মনে হয়েছিল, আমি কোনদিন জানতে পারিনি।
১৯৯৮ সালের কথা বলতে চাচ্ছিলাম, ৯৭ তে কেমন করে চলে গেলাম জানি না। যাই হোক, ১৯৯৮ সালে স্মৃতিগুলো কেমন যেন সেপিয়া মোডের মনে হয় আমার কাছে। সময়টা কেন যেন সন্ধ্যার মত। ঢাকা শহরে তখন খুব জোরেশোরে মশক নিধন কর্মসূচি চলছিল। প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ম করে মশার ওষুধ দেওয়া হত।
১৯৯৮ সালের স্মৃতির কথা বলতে গেলে আমার মশার ওষুধের গন্ধ মনে পড়ে। আটানব্বই সালে ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ হচ্ছিল। একদিন সেলুনে চুল কাটানোর সময় পাশে দাঁড়িয়ে আমার মাথা ধরে থাকা আব্বু বলল, অমুক ফুটবলার কালকে ডি-বক্সের বাইরে থেকে গোল দিছে। আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি, ডি-বক্স কি জিনিস আমি তাই জানিনা। সে নাই জানতে পারি, কিন্তু ৯৮ এর ওয়ার্ল্ডকাপে একজন ফুটবলার ডি বক্সের বাইরে থেকে গোল দিয়েছিল, এই তথ্য আমার মাথায় আজীবনের জন্য রয়ে গেল। মাঝে মাঝে মনে হয়, কে গোল দিয়েছিল, একটু খুজে বের করি। বের করা হয় না, আলস্যি লাগে...
১৯৯৯ সালের বছরটা আমার পরিষ্কার মনে আছে। ক্লাস টু তে পড়ি। ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের বছর। ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ ছাড়া আরেকটা কারণে ১৯৯৯ সাল গুরুত্বপূর্ণ। এই বছর আমি আরো অনেক বইয়ের সাথে তিনটা বই পড়ি। এরিক মারিয়া রেমার্কের অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, এনা ফ্র্যাংকের ডায়েরি আর হুমায়ূন আহমেদের হিমূর রূপালী রাত্রি। ক্লাস টু অনেক ছোট ক্লাস। ছোট ক্লাসের বাচ্চাদের মনে কিছু দাগ কেটে গেলে জিনিসটা থেকে বের হওয়া যায়না। আমিও বের হতে পারিনি। ওইখানেই আটকে আছি।
জীবন ওলট-পালট করে দেয়া দুই একটা বছরের কথা বললে ১৯৯৮ সালের পর আসে ২০০২ সালের কথা। আমি গবর্ণমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্র। তিন গোয়েন্দা সব শেষ করে আমি তার আগের ডিসেম্বরে মাসুদ রানা ধরেছি। আমি তখন প্রচুর বই পড়ি। আশেপাশে প্রচুর বইপড়া মানুষ। সব রকমের বই হাতের কাছে। শিশু বয়সের পড়া বই মানুষের মনে দাগ কেটে যায় ভীষণ। আমি দাগে দাগে দাগায়িত হই।
ক্লাস ফাইভের এ সেকশনের ক্লাস টিচার ছিলেন ফজলুল হক স্যার। অভিজ্ঞ মানুষ। ক্লাসে বলতেন, ৩২ বছরে ৩২ সেট বান্দর পার করে আসছি, তোরা ৩৩ নম্বর সেট। অসাধারণ শিক্ষক, গণিতের শতকরার হিসাব সেই যে শিখলাম, আর ভুলতে পারি না।
জীবন তখন খুব এলোমেলো। সাজিদের বয়স তখন এক, মা নতুন চাকরিতে ঢুকছে। আমি আমার মত খাই দাই, ঘুরে বেড়াই। কিন্তু নিজের মত থাকা আমার সেই তখন থেকে শেখা... আমি স্কুলে যাই, পড়াশুনা করতে মনে চাইলে করি, নাহলে বই পড়ি।
২০০২ এর বর্ষার কথা কারো মনে আছে কি না আমি জানি না। আমার আবছাভাবে মনে পড়ে, ওবছর প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। গবর্ণমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের বিশাল মাঠ তখন একদম সবুজ। আমি ক্লাসের পরে সেই মাঠে খেলি, দৌড়াদৌড়ি করি। মাঠের ওই মাথায় স্যারদের কোয়ার্টার, তার পাশে এক অদ্ভুত দোতলা বাড়ি, খুব রহস্যময় মনে হয়। ঐ বাড়িতে কোনদিন আমি মানুষ দেখিনি, মাঝেমাঝে সেই বাড়িতে ঢুকি, খুব এডভেঞ্চার হয়...
মার্চ মাসের কোন এক সন্ধ্যায় রওনা দিলাম সাভার ক্যান্টনমেন্টে...মামার বাসায় বেড়াতে যাবার জন্য। মতিঝিল থেকে তখন সাভার পর্যন্ত নতুন এসি বাস চালু হয়েছে, আমার জীবনের প্রথম এসি বাস ভ্রমণ। ঘোর সন্ধ্যায় রওনা দিলাম, কিছুদূর যাবার পর তুমুল ঝড়বৃষ্টি, আহা... অনেক রাতে গিয়ে (অন্তত তখন মনে হচ্ছিল) যখন পৌছালাম, তখনো বৃষ্টি... আহারে, কী সুন্দর, কী সুন্দর...
একুশে টিভিতে জাপান ভিডিও টপিক নামে একটা অনুষ্ঠান হত। জাপানের স্টেডিয়াম দেখে মাথা নষ্ট হয়ে যায়, কী সাংঘাতিক, স্টেডিয়ামের ছাদ পর্যন্ত খুলে ফেলা যায়। জাপানের তরুণরা সারাদিন টেক্সটিং করে, দেখে তাজ্জব হয়ে যাই। আমি আর আমার মামাতো ভাই পাভেল ভাইয়া এই দিয়ে সারাদিন আলাপ করি, সত্যিই সাংঘাতিক। পাভেল ভাইয়ার কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের ফ্লাইট সিমুলেটর খেলি, চারিদিকে আনন্দ। ভাইয়ার সাথে বসে দুইটা সিনেমা দেখে ফেললাম একদিন, নিকোলাস কেজের উইন্ডটকারস, আর মেল গিবসনের উই ওয়্যার সোলজার্স। মারাত্মক সিনেমা। গায়ে কাটা দেয়। উইন্ডটকারস দেখে নিজেদের কোড ল্যাঙ্গুয়েজ চালু করার পরিকল্পনা করলাম ...
ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার পর আমি আমার রেডিও নিয়ে বসলাম। আমার একটা ছোট্ট পকেট রেডিও ছিল, ইয়ো ইয়ো শেপের। ১৯৯৭ সালে মাদারীপুর থাকাকালীন কোকাকোলার কোন এক ক্যাম্পেইনের পার্ট হিসেবে এই রেডিওটা দেওয়া হয়েছিল, আব্বু পেয়েছিল কোথাও থেকে, আমাকে দিয়ে দিয়েছিল। স্পিকার ছিল না, হেডফোন লাগায়ে শোনা লাগত, ভেতরে ঘড়ির ব্যাটারির মত একটা ব্যাটারি, খুব সুন্দর জিনিস। এফ এম চ্যানেল তখনো আসেনি, বাংলাদেশ বেতারের প্রোগ্রাম শোনা যেত, সন্ধ্যার দিকে। পরীক্ষার পর আমি আমাদের খোলা বারান্দায় চেয়ারে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বই পড়ছি, বা রেডিও শুনছি, এখন ভাবলেও আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়...
ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার পর শার্লক হোমস সমগ্র হাতে আসে, মনে আছে, এখনো ঐ অনুভূতির কথা মনে হলে গায়ে কাটা দেয়। আমি এখন খেলাধুলা সম্পর্কে কিছু জানি না, সত্যি জানি না। আমি এখন কোন দলের কোন খেলোয়াড়ের নাম পর্যন্ত জানি না, কিন্তু তখন খুব ভাল করে জানতাম, সবাইকে চিনতাম। ওয়ার্ল্ড কাপের আগে থেকে ঘুম হয় না। বেকহামের পা ভেঙ্গে গেছে, সান পত্রিকার কাভারে তার পায়ের ছবি দিয়ে সবাইকে বলা হয়েছে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থণা করতে, জিদান ইঞ্জুরড, খেলবে কি খেলবে না, বুঝতে পারছি না, আর্জেন্টিনার বাতিস্তুতা, আর এদিকে আমার হিরো রোনাল্ডোর ফর্ম নাই। রোনাল্ডো পরে, আমার ব্রাজিলই কোয়ালিফাই করতে পারে না... যা তা অবস্থা। আমি রাত জেগে খেলা দেখি না, দেখতে পারি না, আমার খুব ঘুম আসে।
সেবছরের ওয়ার্ল্ড কাপ হল জাপান-কোরিয়ায়, সব ম্যাচ দুপুরে। আমি স্কুল থেকে এসেই খেলা দেখতে বসি, কী আনন্দ! এই বিশ্বকাপের সব ম্যাচ (দুই একটা ছাড়া) আমি দেখি। আর জীবনেও কোনদিন দেখি নাই, দেখতে পারি নাই। ওয়ার্ল্ড কাপ যেদিন শুরু হয়, সেদিন আমরা উত্তরা, খালামনির বাসায়। ফ্রান্স আর সেনেগালের ম্যাচ দিয়ে শুরু, প্রথম ম্যাচে ফ্রান্স এক গোলে হারল, পেপ বুব দিওপের (তখন পত্রিকায় এভাবে নামের বানান লিখত) গোলে, সেনেগালকে মনে হল আত্মার আত্মীয়, আগের ফাইনালে ব্রাজিলকে হারানোর জন্য আমি তখনো ফ্রান্সকে দেখতে পারি না। সেদিনের সন্ধ্যার কথাও মনে পড়ে, যখন ফিরে আসছি, কেন জানি না, খুব মেঘলা ছিল আকাশটা। অনেক কিছুই আজ আর মনে করতে পারি না, কিন্তু ঐ সন্ধ্যাটার কথাও মাথা থেকে যায়না...
ওয়ার্ল্ড কাপে ছিলাম, ব্রাজিল ইংল্যান্ড খেলার দিন আমি ছিলাম ফ্যান্টাসি কিংডমে। অনেক আনন্দ, কিন্তু মাথায় টেনশন, কী হবে... ফ্যান্টাসির ভিতরে ঘুরতে ঘুরতে কোন এক জায়গায় মনে হয় একটা টিভি দেখলাম, খেলা শেষ, আমি এক আংকেলকে জিজ্ঞেস করলাম, খেলার রেজাল্ট কী, আহা, এই আনন্দ আমি ভুলতে পারব না, তখনো জানি না রোনালদিনহোর কী গোল আমি মিস করে ফেলেছি... ফাইনালে জেতার পরের দুই দিন কথা বলতে পারি নাই, গলা ভেঙ্গে গেছিল...
সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষার সময় আমার হাতে আসে জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি। আমাদের ড্রয়িং রুমে উত্তর দিকের জানালার পাশে একটা পুরানো সোফা ছিল, যার পাশে একটা উচু টেবিল। ওই সোফায় শুয়ে থাকলে টেবিলের জন্যে আমাকে দেখা যেত না। আমি পরীক্ষা দিয়ে এসে ঐ সোফায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ি। রুমির জন্য মন কাঁদে, শিশু বয়সের আবেগ, অনেক শক্ত। গোরান টেম্পুস্ট্যান্ডের আবেদিন লাইব্রেরির আমি তখন মেম্বার। পরীক্ষা দিয়ে আমি মাসুদ রানার বই নিয়ে আসলাম একটা, শ্বেত সন্ত্রাস। পড়তে পড়তে গায়ে কাটা দেয়, খলিফার পরিচয় জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, দমবন্ধ করা পরিস্থিতি একটা। ওই বছরই পড়লাম মার্থা মেকেনার আমি গুপ্তচর। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ২০০২ সালের বইমেলায় হ্যারি পটার এন্ড দি ফিলোসফারস স্টোনের বাংলা অনুবাদ কিনলাম, অনুবাদ কেমন সেটা আলাদা কথা, তবে অদ্ভুত এক পৃথিবীর সাথে আমার সেই থেকে পরিচয়। শান্তা পরিবার বের হল ওই বছর। শান্তা মরে গিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়া পরিবারটার জন্য কেন জানি খুব মায়া জন্মে গেল। বইমেলার একটা কথা মনে পড়ল, আমি সারা বছর ধরে জমানো একগাদা পাঁচ টাকার কয়েন নিয়ে বইমেলায় গেছিলাম। স্টলের লোকটা খুব আদরের একটা হাসি দিয়ে ধৈর্য ধরে সেই কয়েনগুলো গুনে নিয়েছিল। বড় ভাল লোক ছিল...
২০০২ সম্ভবত পলিথিন নিষিদ্ধের বছর। দোকানদারেরা পলিথিন নিষিদ্ধের পর হাতলছাড়া পলিথিনের পোটলায় জিনিসপত্র দেওয়া শুরু করল, এই জিনিস এখনো চলছে, হাতলটা শুধু বাদ গেছে। ২০০২ এ কেরোসিনের রং নীল হয়ে গেল, রাস্তায় সিএনজি নামল, সেই সিএনজি ব্যাক গিয়ারে দিয়ে পেছানোর সময় এদ্ভুত এক মিউজিক হয়। জীবন বড় অদ্ভুত লাগে...
ক্লাস ফাইভে আমি কোন এক জায়গায় জেমস বন্ডের মুভি দেখলাম, "টুমরো নেভার ডাইজ"। ব্রসনান, জাস্ট খুন করে ফেলল লোকটা আমাকে। ২০০২ দেবদাসের বছর। শাহরুখ মরে যাওয়ার পরে খুব ক্ষেপে গেলাম, স্টুপিড একটা লোক, স্টুপিড মুভি। ভুলে গেছিলাম, ২০০২ কাভি খুশি কাভি গামেরও বছর। বিয়েশাদিতে বোল চুড়িয়া না বাজলে বিয়েশাদি পোক্ত হয়না, এমন একটা কথা তখন বাজারে প্রচলিত...
২০০২ অনেক না পাওয়ার বছর, কিন্তু এখন মনে হয় জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার বছরও ওইটা। নিজের মত করে থাকতে শেখার বছর ওইটা, স্বাবলম্বী হওয়ার বছর ওইটা, অনেক সাহস করার বছর ওইটা, আমার আমি হয়ে ওঠারও বছর হয়ত ওইটাই... পুনশ্চঃ ২০০৩ এ আমি আইডিয়ালে ভর্তি হই। সে আরেক ইতিহাস...
কেউ যদি হঠাৎ করে আইডিয়াল লাইফ নিয়ে কিছু লিখতে বলে, মাথায় বাজ পড়ার মত অনুভূতি হওয়া অতি স্বাভাবিক । আইডিয়াল এর প্রতিটা দিন নিয়েই যে এক একটা মহকাব্য লেখা যাবে... আরো বড় একটা সমস্যা হল - একসাথে এত্ত স্মৃতি ভীড় করে আসে... কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখবো, তাই নিয়ে মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়...লেখা আর হয় না।
লেখা শুরু করে প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এল...তা হল আইডিয়াল এর কোন জিনিসটা আমার সবচেয়ে প্রিয় ? কিছুক্ষন চিন্তা করতেই উত্তরটা বেরিয়ে এল...সহজ উত্তর... সবকিছু...। আসলে আমরা আইডিয়াল বলতে সব কিছুকেই বুঝি...কোন একটা বিষয়ের মধ্যে আইডিয়াল এর ভাললাগাকে আবদ্ধ করে রাখা মহা অন্যায়। আইডিয়াল মানে একসাথে ক্লাস শুরুর আগে লাল গেট এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, হুড়োহুড়ি করে স্কুল এ ঢোকা, যেদিন সবচেয়ে চড়া রোদ উঠবে – সেদিন মাঠে দাঁড়িয়ে সমাবেশ করা, তালিম শোনা , এবং............ ক্লাস করা… । ক্লাস...এই শব্দটা শুনলেই বুকের মধ্যে কি যেন আকুলি বিকুলি করে ওঠে... আইডিয়াল এর যত মজার স্মৃতি, তা যে ক্লাস নিয়েই...
আইডিয়াল এর এক একজনের এক এক কাহিনি... “সাকিব” নামের আমরা ছিলাম মাত্র ৭ জন... কখনো কখনো এক সেকশন এ চার জন সাকিব ও একসাথে ক্লাস করেছি... এখনও হঠাৎ ফোন আসলে...
:কে?
:আমি,সাকিব
ঃ কোন সাকিব?
ঃআজিব, আইডিয়াল এর সাকিব।
ঃআরে, আজব ত...আইডিয়াল এর সাকিব ৭ টা, তুই কে?
ঃ দোস্ত, আমি, সাদমান সাকিব...
ঃ দোস্ত, সাদমান সাকিব ও ২ টা... তোর টাইটেল ক.....
“০”
অঙ্কটার মাহাত্ম আমাদের চেয়ে ভাল আর কে জানে???আইডিয়াল লাইফের বিভীষিকা বলতে যা বোঝায়... শূন্য ছিল তাই। শূন্যের এর ভয়ে কোথায় কোথায় ডাইরি লুকাইনি আমরা? বেঞ্চের তলায়... শেষের দিকে তো স্যার দের কাবার্ডেই লুকিয়ে রাখতাম। তুষার ক্যাপ্টেন ছিল, আহা, বড় ভাল ক্যাপ্টেন... ক্লাস ঠাণ্ডা রাখার জন্যে বোর্ড এ রোল লিখত, স্যার আসার আগে আবার মুছেও দিত।
ক্লাস সেভেন এ থাকতে একবার রাফিদের রোল বোর্ড এ লিখেছিলাম... ফলাফল... ওর ডাইরিতে শূন্য... মাঝে মাঝে মনে হয়... ও আমাকে ধরে ধোলাই দেয়নি কেন?
প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে রাতুল (রাতুল খান) দুনিয়ার তাবৎ বিষয় নিয়ে আমাকে কিছুক্ষন জ্ঞান দিত... ওর জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা প্রায় সবই মাথার উপর দিয়ে যেত... বইমেলায় গিয়ে ঢাউস সাইজের বিশ্বকোষ কেনা রাতুলকে দিয়েই সম্ভব...
আইডিয়াল স্কুলের মত এমন অদ্ভুত টিফিন পিরিয়ড দুনিয়ার আর কোন স্কুল এ নেই বোধহয়... ২.০৫ থেকে ২.১২ ... ৭ মিনিট... ক্লাস শেষে টিফিন ক্যাপ্টেন টিফিন বিলি করতেই চলে যেত ৫ মিনিট... ২ মিনিট এ যা পারো খাও... তারপর দৌড়... অজুর লাইন... এক বন্ধু প্রতিদিন হটপট এ করে ভাত নিয়ে আসত... পেপসির বোতল এ ডাল... ট্যাং মনে করে কে যেন একবার চুমুক দিয়ে বসেছিল... অনেকদিন এমন হয়েছে... স্যার এর দৌড়ানি খেয়ে ও হাতে মুরগির রান নিয়ে দৌড়াচ্ছে...পিছনে বেত হাতে স্যার...
প্রায় দিনই হেডস্যার এর ঘোষণা শোনা যেত...”টিফিন এ বাক্স ভরে ভাত আনার কোন দরকার নেই”...
কাড়াকাড়ি করে টিফিন খাওয়া ছিল আরেক মজা... আমি সারা ক্লাস টহল দিতাম... যার টিফিন ভাল লাগত এক খাবলা তুলে নিতাম... সবাই না... আমরা কয়েকজন...
টিফিন শেষ করে দৌড়... অজুর লাইন... অজু করতে গিয়ে কতদিন যে বুকপকেট থেকে ৫ টাকার কয়েন ওই ড্রেন এর মধ্যে পড়েছে...
আইডিয়াল এ একসাথে নামাজ পড়াটা আসলেই জীবনের অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা... আমার স্পষ্ট মনে আছে...ক্লাস টেন এ শেষ যেদিন জামাতে নামাজ পড়লাম... নামাজ থেকে ফেরার পথে আমি অনেকের চোখেই পানি দেখেছি....
খালি পায়ে স্কুল থেকে মসজিদ, আর মসজিদ থেকে ক্লাস... তারপর কাদামাখা পায়ে জুতা পরা(মোজা ছাড়া), প্যান্ট ভাজ করে উঠানো...আমরা...
ফোর্থ পিরিয়ড এ কি যে ঘুম আসত...... সময়টাও অসাধারণ ... বিকাল ২.৫৫... বাইরে ঝাঝা রোদ্দুর, আর ভেতরে আমরা ঝিমুচ্ছি...... নিন্দুকেরা বলে ... একবার নাকি পুরো ফোর্থ পিরিয়ড আমি ঘুমিয়ে পার করেছিলাম... জানালার পাশে যেকদিন সিট পড়ত... বড় ভাগ্যবান মনে হত নিজেকে...
আইডিয়াল এর সামনে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল...এখনো আছে... ফুলে ফুলে গাছটা যখন ভরে যেত... বড় ভাল লাগত দেখতে...
৪.৩০ থেকেই আমাদের উশখুশ করা শুরু হত... কখন ছুটি হবে... ৫.২০ এ ছুটি......তারপর... ফেনলি আর প্যারামাউন্ট...
ক্লাস নাইন এ থাকতে বিজ্ঞান মেলা হল...... দেয়াল পত্রিকার নাম করে আমরা কয়েকজন... আমি , রাতুল, রাকিন,সাকিব, তুষার, অয়ন, তন্ময়, তকি- ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পুরো স্কুল ঘুরে বেড়াতাম... খালি আমরা না, ক্লাস করতে করতে যার টায়ার্ড লাগত, সেই একবার করে ঘুরে আসত... রফিক স্যার একবার ধরে ফেললেন... ক্লাস টিচার এর সাইন করা ৫ জন এর নাম দিতে হবে... দিলাম...সবার অবাধ ঘোরাঘুরি বন্ধ...
ক্লাস শেষ করে সবাই মিলে হাঁটতে হাঁটতে কলোনির মধ্যে দিয়ে আসা...ঝালমুড়ি না হয় আইসক্রিম কিনে খাওয়া...
আইডিয়াল এ প্রথম কয়েক বছর যাওয়া আসা করতাম হামজার সাথে... চুপচাপ, শান্তশিষ্ট এই ছেলেটির মত ভাল ছেলে আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি... আমার মহা সৌভাগ্য ... ছেলেটি আমাকে বন্ধু বলে মনে করে ...... আসলেই ......
প্রায় দিন আমি আর রাফিদ স্কুল থেকে একসাথে ফিরতাম । ফেনলির সামনে দাঁড়ালে অনেকদূর থেকেই দেখা যেত, মহাশয় আসছেন...অন্য সবার মাথার থেকে ১ হাত উপরে ওর মাথা দেখা যেত। ১০ টাকা দিয়ে এক বোতল পেপসি কিনতাম...অর্ধেকটা খেয়ে বোতলটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিতাম...... বাকিটা খেয়ে ও বলত,”চল...”
আইডিয়াল এর শেষের কয়েকটা দিন ছিল অসাধারণ... আমি টেস্ট এর পরের কোচিং ক্লাস এর সময়টার কথা বলছি... জানিনা কেন, সময়টা খুব আনন্দে কেটেছে... জুনিয়র ব্যাচ এর ছেলেদের কাছে শুনেছি... ওদেরও নাকি সময়টা খুব ভাল কেটেছে... আইডিয়াল এর কোচিং ক্লাস এ কি আছে কে জানে...
স্যাররা ছিলেন অসাধারণ... অসাধারণ না... অ এর পরে ১০ টা স দিয়ে অসাধারণ...
বড়ুয়া স্যারকে একবার একজন জিজ্ঞেস করল, “স্যার, ফুয়াদ যে জংলি গানটা গেয়েছে, শুনেছেন?”
স্যার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কোন ফুয়াদ, শাখা ৮ এর ফুয়াদ ? ও জংলি গান কেন গাবে?”
স্যাররা যে আমাদের কতটা ভালবাসেন... মাঝে মাঝে চিন্তা করে খুব ভাল লাগে...... ক্লাস সেভেন এ ক্লাস টিচার ছিলেন শামসুদ্দিন স্যার। অনেক দিন পরে স্যার এর সাথে রাস্তায় দেখা, সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,”স্যার, চিনতে পেরেছেন?”
স্যার বললেন,”কেন নয়? সাকিব,২০০৮ ব্যাচ”। ধন্য মনে হয় নিজেকে...এরকম একজন অধম এর কথাও স্যার এর মনে আছে ......
পাশ করার পরে প্রথম যেদিন স্কুল এ যাই, আদ্ভুত একটা অনুভুতি হয়েছিল... মনে হয়েছিল যেন ঘরের ছেলে অনেক দিন পরে ঘরে ফিরেছি...
আইডিয়াল এর ছাত্রদের মাঝে অদ্ভুত এক বন্ধন আছে মনে হয়, যেখানেই যাই, কেমন করে যেন আমরা আমরাই জোট পাকাই....... কথাটা অদ্ভুত মনে হলেও সত্যি... স্কুল পাশ করার পরে যতবার আড্ডা দিয়েছি, সকল আড্ডাই আইডিয়াল এর স্মৃতিচারণে গিয়ে শেষ হয়।এমন না, যে বন্ধুদের সাথে অনেক দিন পরে দেখা হচ্ছে...প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে... তবুও আমাদের আড্ডার বিষয় সেই আইডিয়াল... কে কবে কোন ক্লাস এ কি করেছে... কে কোথায় ডাইরি লুকিয়েছিল...ঘুরে ফিরে সেসব কথাই চলে আসে।
এখন রাত ১২ টা বাজে। আইডিয়াল এর স্মৃতিচারন সারা রাতেও লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। তাই সে চেষ্টা না করাই সমীচীন। আইডিয়াল এর অনেক বন্ধুর সাথেই অনেকদিন দেখা নেই... সবার জন্যে মনে একটাই কামনা... দোস্ত, ভাল থাকিস।
আইডিয়াল কেন এত ভালবাসি তার উত্তর দেওয়া খুব একটা সহজ না। আইডিয়ালে আসি ক্লাস সিক্সে।
আব্বু মারা গেল ক্লাস থ্রীতে থাকতে। দুইটা পরীক্ষা দেই নাই। রোল নাম্বার ৪ থেকে হয়ে গেল ২৫। ছন্নছাড়া অবস্থা। আম্মু সাজিদকে নিয়ে, সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমি একা। আমি একা পড়াশুনা করি। কেমন করে পড়ব জানি না, কী পড়ব জানি না। ক্লাস থ্রী পর্যন্ত আম্মু নিজে পড়াইছে, আমি পড়ছি। এখন ফোরে উঠে আমি কী করব বুঝি না। পড়ি, রেজাল্ট খারাপ হয়। ওই স্কুলে স্যার এর কাছে পড়া লাগে। স্যার এর বাসায় নিয়ে যাওয়ার মানুষ নাই। স্যার এর বাসা কী, স্কুলে কেমন করে যাব, তারই ঠিক নাই। রেজাল্ট খারাপ হয়, আমি দিন দিন বখাটেপানা শুরু করি। (এটা অনেকে মানবে না, আমি জানি। যারা আমাকে ক্লাস ফোর ফাইভে দেখছে, তারা অবশ্য দ্বিমত করবে না ) । আগে রেজাল্ট বেশ ভাল হইত। এই সময় দেখলাম ক্লাসের ভাল ছাত্ররা আমাকে আর গোনে না। আমি ক্লাস ফোরে পড়ি...
যেহেতু ভাল ছাত্ররা আমার সাথে মেশে না, এবং আমি পড়াশুনা মোটামুটি ছেড়ে দিছি, সেহেতু আমি ক্লাসের পেছনের ছেলেদের সাথে মিশতে শুরু করলাম। বখাটে ছেলে। যারা পুরা স্কুলে মার্কামারা। (পরে এদের খবর নিছি, মেট্রিক পাশ করে নাই যতদূর জানি )। এই বন্ধু বান্ধবের এফেক্ট আমার কাজকর্ম চলাফেরায় দেখা যেতে লাগল। বাসায় সবাই চিন্তা করে, আত্নীয় স্বজন চিন্তা করে।
আমার বাসা ছোটবেলা থেকেই খিলগাঁয়ে। এইদিকে আইডিয়াল স্কুলের খুব সুনাম। জোড়া বেত দিয়ে পিটায় নাকি এইখানে গাধা মানুষ করে ফেলা হয়। এক এই আশায় ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে ওঠার সময় আমাকে আইডিয়ালে ভর্তি পরীক্ষা দেওানো হয়। আইডিয়ালের বাংলা আর ইংলিশ আমি ধরেও দেখতে পারি নাই (আমি না, যারা টিকছে, তারা কেউই পারে নাই , পরে শুনছি।) খালি অঙ্ক ফুল আনসার করে আসছিলাম। তাও পারছিলাম ক্লাস ফাইভের আমার ক্লাসটিচার ফজলুল হক স্যার এর কারনে, স্যার অঙ্ক একদম হাতে ধরে শিখাইত। আমি এখনও ভুলি নাই। যাই হোক, আইডিয়ালে টিকে গেলাম।
আইডিয়ালে আসার পরে আমার একটা মাত্র জিনিস মাথায় কাজ করছে। এইটা আমার সেকেন্ড লাইফ। (ক্লাস সিক্সে চিন্তাটা একটু ভারী ই ছিল, কিন্তু আমি তো এমনই... সবাই জানে ) ।
সেকেন্ড লাইফে আমি যেই জিনিসে পরিনত হই, সেটা এখনও আছি।
আমার ছোটকালের ফ্রেন্ডরা আমার ওই আমার সাথে আমাকে মিলাতে পারে না, আইডিয়ালের ফ্রেন্ডরাও সব কাজের ব্যখ্যা খুজে পায় না। তার কারন এই একটাই, আমি দুইটা লাইফ লিড করছি।
আইডিয়াল গাধা পিটায়ে মানুষ করতে পারে কি না, জানি না। তবে আমার মত ডিরেইল্ড একটা ছেলের এইখানে আসার পিছনে কাউকে যদি ক্রেডিট দিতে হয়, আমি চোখ বন্ধ করে সেই ক্রেডিট আইডিয়ালকে দিয়ে দিব...
আমরা যারা ঢাকা শহরে পালিত-বাড়িত, গাছপালা সম্পর্কে তাদের জ্ঞ্যানের পরিধি কতটুকু , সেটা না বললেও বোঝা যায়। ধানগাছের তৈরী ফার্নিচার কতটুকু মজবুত, বা আমড়া কাঠের ঢেকি দিয়ে চাল ভানতে কত সুবিধা, সেগুলোও আমরা খুব ভাল করে জানি, তা না। আমি নিজে গাছ চিনি দুইটা। একটা হল বটগাছ। মোটা গুড়ির আর ছড়ানো মাথার কোন গাছ দেখলেই আমার মনে হয় জিনিসটা বটগাছ। বটগাছ ছাড়া আমি আরেকটা যে গাছ চিনি, সেইটা একটু অদ্ভুত। কৃষ্ণচূড়া গাছ। ইভেন কৃষ্ণচূড়া গাছের প্রতি আমার একটা ভালবাসা আছে বলা যায়।
ভালবাসার সূত্রপাত একটু অন্যভাবে। মতিঝিলের পীরজঙ্গি মাজার থেকে আরামবাগের দিকে যেতে রাস্তার দুইপাশে অনেকগুলা কৃষ্ণচূড়া গাছ। একটা ছিল আমাদের স্কুলের একদম সামনে। ক্লাস সেভেনে চারতালার যেই রুমে আমাদের ক্লাস হত, ৪০৩ নম্বর রুম, সেটার জানালার ঠিক পাশে ছিল একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। বছরের এই সময়টায়, গরমে সবার জিহবা যখন আধহাত ঝুলে যেত, তখন আমরা ডে শিফটে ক্লাস করতাম। টিফিন পিরিয়ড শেষ হইত বিকাল (অথবা দুপুর) ৩ টায়। টিফিনের পরের প্রথম পিরিয়ডটা খুব অদ্ভুত। মতিঝিলের ব্যস্ততম ওই রাস্তায়ও তখন কোন গাড়ি চলত না। সত্যিকারের ক্লান্ত দুপুর বলতে যা বুঝায় ,তাই। রাস্তার ওইপারের কলোনীর বাসিন্দারা, (ক্লাসে ফাকে ফাকে আমরা যাদের নিত্যদিনের কার্যকলাপ দেখতাম) তারাও মনে হয় দুপুরে খাওয়ার পরে ভাতঘুম দিতে যেত। অর্ধেক পৃথিবী তখন ঘুমায়, বাকি অর্ধেক তখন ঝিমায়, এমন এক অদ্ভুত সময়ে ছিল আমাদের ফোর্থ পিরিয়ড। ক্লাসের ছেলেপেলেও টিফিন পিরিয়ডে দৌড়ঝাপ করে, মারামারি করে , ওযু করে , নামাজ পড়ে এসে ক্লান্ত, অথবা তারা ছুটির পরে আবার নতুন উদ্যমে বান্দরামি শুরু করার জন্যে রিচার্জ হচ্ছে। কিচ্ছু করার নাই এই সময়টায়। এই সময়টায় আমার প্রতিদিন দুনিয়া ভেঙ্গে ঘুম আসত। বাই রোটেশন সিট চেঞ্জ হওয়ার কারনে দুই একমাস পরপর একমাসের জন্যে সিট পড়ত জানালার পাশে। আহা, মধু। জানালার পাশে বসে ফোর্থ পিরিয়ডে ওই কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখতে দেখতে মনে হত আমি ঘোরের মধ্যে চলে গেছি। কী সুন্দর লাল লাল ফুল, পিছনে সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ড। লিলুয়া বাতাস বয়ে যাওয়া ওই দুপুরে, অর্ধেক ঘুম আর অর্ধেক জাগরনে, সেই কৃষ্ণচূড়া গাছগুলা একটা সময়ে খুব আপন মনে হতে থাকে...
এসএসসি পরীক্ষার সালামীর টাকার সাথে মা'র কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আমি একটি মোবাইল ফোন খরিদ করি। গান শোনার শখ ছিল, বাজারে তখন বড় ডিসপ্লের চাইনিজ মোবাইল এভেইলেবল, আমি কিনলাম গান শোনার জন্যে ভাল এমন একটা ছোট্ট ফোন। ফোন কিনে টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় ফোনের সাথে মেমোরি কার্ড কেনা সম্ভব হয়নি। মেমোরি কার্ড কেনা হয়েছিল, এসএসসির রেজাল্টের পরে আরেক দফা সালামী পাওয়ার পরে। বাজারে তখন এক গিগাবাইটের মেমোরি কার্ড এসেছে, কিন্তু খুবই উচ্চমূল্য। সালামীর টাকা সব খরচ করা সম্ভব না, কলেজে নাকি বন্ধুবান্ধব নিয়ে নানান খরচ, হাতে কিছু টাকা রাখতে হয়। সালামীর টাকা থেকে আমি এক গিগাবাইটের একটি মেমোরি কার্ড ক্রয় করি। আমার মোবাইলে ভিজিএ ক্যামেরা, ছবি তুললে কিলোবাইট রেঞ্জে স্পেস অকুপাই করে। বাকি যায়গা গানের জন্যে। মোবাইলে গান ভরা আরেক সাধনা। আমার কম্পিউটার নাই। কম্পিউটার ছাড়া মোবাইলে গান ভরার কোন কৌশলও আমার জানা নাই। আমি আমার মোবাইল ফোন আর ডাটা কেবল নিয়ে মামার বাসায় যাই। পাভেল ভাইয়া খুব ভাল মানুষ। তার কম্পিউটারে নানান প্রকারের গান থাকে। আমি সেখান থেকে মোবাইলে গান লোড করি। কিছুদিন পরে ভাইয়া ইন্টারনেট কানেকশন নিল। ব্যপারটা কতটা চমকপ্রদ আমরা তখনো বুঝতে পারিনি। আমি পেপার মারফত গুগলের নাম শুনেছি। একদিন আবিষ্কার করলাম গুগল আলাদীনের দৈত্যের মত। তার কাছে নাম বললে সে অনেক মজার জিনিস হাজির করতে পারে। অনেক গান, যেগুলো ছোটকালে শুনেছি, কেবল দুই একটা শব্দ মনে ছিল, সেগুলো গুগল দিয়ে খুঁজে বের করে ফেলা গেল। অদ্ভুত আনন্দ। আমি কিছুদিন পরপর মামার বাসায় যাই, মোবাইলে গান ভরে নিয়ে আসি। মোবাইলে বেশি গান ধরে না। সব মিলিয়ে এক দেড়শ। কোন গান রাখব, আর কোন গান রাখব না, বেশ চিন্তা ভাবনা করতে হয়।
এর কিছুদিন পরে আমাকে একটা কম্পিউটার কিনে দেওয়া হয়, তবে তাতে ইন্টারনেট ছিল না। সিডি কিনে সেখান থেকে মোবাইলে গান ভরে নিতে হত। আমি এর-ওর থেকে সিডি এনে কম্পিউটারে ভরি, সেই গান থেকে বাছাই করে মোবাইলে ভরি। খুব ক্রিটিকাল কাজ। মোবাইলের গানগুলো খুব জরুরী। আমি তখন সারাদিন কানে হেডফোন দিয়ে ঘুরি। মাইলাইন নয় মিডওয়ে বাসে করে গান শুনতে শুনতে ঢাকা কলেজে যাই। আমার শার্টের ভেতর দিয়ে হেডফোনের তার লুকানো থাকে, আর ইয়ারপিসগুলো কলারের কাছে উকিঝুকি মারতে থাকে। মোবাইলে লাগানোই থাকে, দরকারের সময় জাস্ট টান দিয়ে কানে গুজে দিতে হয়। সোয়াগ কথাটা তখনো বাজারে আসেনি, তবে ব্যপারটা বেশ সোয়াগ ছিল বলে আমার আজকাল মনে হয়। ২০০৮-০৯ সালের দিকে খুব সুন্দর সুন্দর কিছু বাংলা এলবাম রিলিজ হয়।
ফুয়াদ তখন বন্য এলবাম রিলিজ করেছে।
তিন্নি গান গাচ্ছে, "ভাবে মন অকারণ সারাক্ষন, অনুভবে সুখের আলোড়ন।"
তপু গান গাচ্ছে, "একটা গোপন কথা ছিল বলবার..."
ক্যাটরিনা কাইফ গোলাপী শাড়ী পরে গাচ্ছে, "তেরি ওর, তেরি ওর, তেরি ওর..."
একোন র্যাপ করছে, "স্ম্যাক দ্যাট"...
অথবা ইন্দ্রানী সেন হৃদয় বিদীর্ণ করে গাইছে, " আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল , সুধাইল না কেহ..."
শাহানা বাজপেয়ী গাচ্ছে, "আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা..."
আমার সব শুনতে ভাল লাগে।
এই সময়টায় মোবাইলের সেই প্রত্যেকটা গান হাজারবার করে শোনা হয়েছে। প্রতিটা গানের কথা আমার মুখস্থ ছিল, সুর পরিচিত ছিল। সময়ে অসময়ে বাসায় গানে টান দিতাম। মেমোরি কার্ড অনেকবার ফরম্যাট দেয়া হয়েছে। গানগুলো যাতে কিছু না হয়, এজন্যে কম্পিউটারে আলাদা ফোল্ডার করে সেভ করা ছিল। কম্পিউটারও অনেকবার সেটাপ দেওয়া হয়েছে। নতুন ল্যাপটপ কেনা হয়েছে। গানের সেই ফোল্ডার সেভাবে এখনো আছে। মাঝে মাঝে শুনি।
গানগুলো চোখ বন্ধ করে শুনতে শুনতে আমার মনে হয় আমি ঢাকা কলেজের পুকুরপাড়ে বসে আছি, ক্লাস হচ্ছে, আমি করছি না, অথবা আমি সাইন্সল্যাবে নেমে হাটতে হাটতে কলেজে যাচ্ছি, অথবা আমি মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, অথবা বিকাল বেলা বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার জন্যে খিলগাঁও এর রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছি।
সীমাবদ্ধতা জিনিসটা সমসময় খারাপ না। সীমাবদ্ধতা অনেক কিছুকে সীমিত করে ফেলে সত্যি, কিন্তু আবেগটাকে অনেক অসীমও করে ফেলে...
ক্লাস সেভেনে থাকতে একবার আজাদ স্যার ক্লাসে সুখের সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করেছিলেন। সুখে থাকা, আর সুখে আছি,এটা বুঝতে পারা এই দুটা জিনিস আসলে আলাদা। মানুষ সুখে থাকে, হয়ত জানে না। জানে না বলে সুখ অনুভব করতে পারে না। "পিছনে ফিরে তাকালে" কথাটা বলার জন্যে যে বয়সকাল অতিক্রম করতে হয়, আমার ধারণা আমি সেই বয়স পার করে ফেলেছি। এখন হয়ত নিরাপদেই বলতে পারি, পিছনে ফিরে তাকালে আমারো মনে হয়, জীবনে একটা সময়ে অনেক সুখে ছিলাম,আর আমি প্রতি মুহূর্তে জানতাম, সুখে আছি।
জীবনের বিভিন্ন অংশ নিয়ে, শৈশব বা কৈশোর নিয়ে অনেক লম্বা লম্বা লেখা লিখেছি। কলেজের জীবন নিয়ে কিছু লিখিনি।আমার মনে হয়, কলেজ জীবনটা মাত্র পৌনে দুই বছরের হলেও এই সময়টার স্মৃতি এত গভীর, লিখে প্রকাশ করতে গেলে এর প্রতি হয়ত অবিচারই করা হবে।
আমি এসএসসি পাশ করি ২০০৮ সালে। এসএসসি পরীক্ষার পরের তিনমাস আমি গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ করিনি। গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলতে আমি যেটা করেছি, সেটা হচ্ছে বাসায় শুয়ে শুয়ে টিভিতে যত হিন্দি এবং ইংরেজি সিনেমা আছে তা সব দেখে শেষ করেছি। ইন্টারনেট হাতে পাইনি, অনেকেই পায়নি। সুতরাং ভ্যালিডেশনের কোন সমস্যা ছিল না। সিনেমা দেখে কাউকে রিভিউ দিয়ে প্রমাণ করতে হত না যে কত "গভীর" সিনেমা দেখে ফেলেছি। সব দেখতাম, আর যা দেখতাম তাতেই আনন্দ পেতাম। কচি বয়স, যা দেখি মনে দাগ কাটে। কিছু সিনেমা দেখে চোখে পানি এসে যায়, বড় নির্ভেজাল আবেগ। পরীক্ষার পর সালামির টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন কিনেছিলাম, বন্ধু বান্ধবেরাও কিনেছিল, কিন্তু আমাদের যোগাযোগ ছিল না। সবার সাথে যোগাযোগ হয় তিনমাস পরে, রেজাল্টের সময়।
এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার পরে আমার মনে হতে থাকে আমি বিশাল ভাল ছাত্র।দেশের সব কলেজ আমাকে নিয়ে ধন্য হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার পছন্দের কলেজ নটর ডেম কলেজ, আইডিয়াল স্কুলের সবার ধারনা থাকে নটর ডেম তাদের নিজের সম্পত্তি, গেট দিয়ে ঢুকে গেলেই ভর্তি করে নেবে। আমিও এই ধারনা নিয়ে বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি ছাড়া ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাই। অনেক কাহিনি ছোট করে বললে দাড়ায়, চান্স পাইনি, বরং একরকম বেইজ্জত হয়েই বের হয়ে এসেছি।
রাইফেলস কলেজ তখন গোল্ডেন পাওয়া ছাত্রদের বিনা বাক্যব্যায়ে ভর্তি করে নিচ্ছে। আমি এবং আইডিয়ালের আরো অনেক নিরাশ্রয় শিক্ষার্থী শেষ ভরসা হিসেবে রাইফেলসে ভর্তি হয়ে গেলাম। বাস ভর্তি করে ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে যাওয়ার দিনই একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে গেল। আইডিয়ালের তুখোড় ভাল ছাত্র, আমার বন্ধু রাকিনের মাথার ক্যাপ এক স্যার জানালা দিয়ে চেলে বাইরে ফেলে দিলেন। আমাদের মাঝে খুব স্থূল প্রতিক্রিয়া হল। আইডিয়াল থেকে বের হয়ে এই সেটাপে পড়াশুনা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না, এক জীবনে এক আইডিয়াল যথেষ্টর চেয়েও বেশি।
আইডিয়ালের সব পোলাপান দল বেধে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। আমি ভর্তি হলাম না, আমার এবং আমার পরিবারের ধারণা ঢাকা কলেজ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে পরিনত করে। আমার মত নেহাত সুবোধ ছেলে ঢাকা কলেজে ভর্তির পর সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়ে নিউমার্কেট এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে, এই ধারনার সাথে আসলে কেউ খুব একটা স্বাচ্ছন্দ বোধ করতে পারেনি। আমি নিজেও পারিনি। এজন্যে আমার সব বন্ধু ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে গেলেও আমি সুবোধপনা বজায় রেখে পরের দিন আবারো রাইফেলসে ক্লাস করতে যাই। কিন্তু পরের দিন আরেক ঘটনা ঘটে গেল, ফার্স্ট ইয়ারের এক ছাত্রকে একজন স্যার কলেজের মাঠে সবার সামনে এমন বাটাম ভাংগা মার দিল, দেখে আমার কলিজা শুকায়ে শুকনা বরইয়ের আকার ধারন করল।
এই পরিস্থিতিতে তিনটা ঘটনা ঘটে। প্রথমত, আমার বাল্যবন্ধু রাফিদ আমাকে ফোন করে যা তা বলল, যার প্রকৃত বক্তব্য আনসেন্সর্ডভাবে লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না, কিন্তু সারমর্ম হচ্ছে, আমি ছাগল, গাধা এবং নির্বোধের মত আচরন করছি।আমার ঢাকা কলেজে পড়া উচিত এবং যেহেতু আমি একান্তই গর্দভ প্রকৃতির মানুষ, আমি এখনো ঢাকা কলেজে ভর্তি না হয়ে ভবিষ্যতে ব্যান্ড পার্টির অধিকারী হতে চলেছি। দ্বিতীয়ত, প্রথম দিন রাইফেলস থেকে ক্লাস করে মাইলাইন বাসে করে খিলগাও আমাদের বাসায় আসতে বাজল রাত আটটা, এসে দেখি মার জ্বর। আমার মা আমার আগামী দুই বছরের যাতায়াতের কষ্টের কথা চিন্তা করে আরো দুর্বল হয়ে গেছে, কিছুটা কান্নাকাটিও করেছে। তৃতীয়ত, কোন কূল কিনারা না পেয়ে আমার গুরু ফারুক ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করা হল। ফারুক ভাই কথা কম বলেন, যা বলেন সেটা মিন করেন। ফারুক ভাই এসে দুইটা বাক্য বললেন, "আপনারা এইটা কী করছেন! নটর ডেমে হয়নাই, ঢাকা কলেজে পড়বে, এখানে দ্বিতীয় কোন চিন্তার সুযোগ নাই।"
ফারুক ভাইয়ের কথার পরে আমার কান্নাকাটিতে ব্যাকুল হয়ে আমার মা সিদ্ধান্ত নিল, তবে ঢাকা কলেজই হোক। মাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "ছেলে যে আগামি ছয় মাসে নিউমার্কেট থানায় মামলা খাবে না, এই রিস্ক কে নেবে"। মার এক কথার উত্তর ছিল, " ছেলে আমার , রিস্ক আমি নিলাম।"
ঢাকা কলেজ জীবন শুরু হল।ঢাকা কলেজের প্রস্তুতি হিসেবে আমি প্রথম দিন ঢাকা কলেজের উল্টা সাইড থেকে ২০ টাকা দিয়ে একটা টিশার্ট খরিদ করলাম। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছে, বিষয়টা কুল,এবং জিন্সের সাথে এই ২০ টাকার টিশার্ট পরে ঢাকা কলেজে ক্লাস করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার ২০,টিশার্ট এই দামেরই হতে হবে। পরের দিন থেকে আমি জিন্স , ২০ টাকার এই টিশার্ট এবং স্যান্ডেল পরে ক্লাস করা শুরু করলাম, এবং হুট করে অনুভব করলাম, আমি বড় আনন্দে আছি।
আইডিয়ালের এক বিশাল দল ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। আমরা সবাই খিলগাও রেলগেট না হয় তালতলা মার্কেট থেকে বাস ভরে কলেজে যাই। বাস দুইটা,মাইলাইন আর মিডওয়ে।ঢাকা কলেজের ছাত্রদের বাসভাড়া লাগেনা বলে শুনতে পাই, এই নিয়ে তুমুল উত্তেজনা। এদিকে আমি আর আমার বন্ধু ভাল ছাত্র রাকিনখুব হতাশ। আইডিয়ালের এক্টা সেকশনের ফার্স্ট বয় নটর ডেমে চান্স না পাওয়ায় আন্টিরা খুব যন্ত্রণা করে। এদিকে রাকিনও এসএসসির পরের তিনমাসে বেশ চেঞ্জ হয়ে গেছে। বেগুনি রংের একটা শার্ট পরে ক্লাসে যায়, যার উপরের তিনটা বোতাম খোলা থাকে, সেখানে এক্টা সানগ্লাস ঝোলে। বিশ্রি পরিস্থিতি।
কলেজে কলেজে গ্যাঞ্জাম। এনডিসির এক ছেলে ফেসবুকে ঢাকা কলেজ নিয়ে বাজে কমেন্ট করছে, তাকে মারার জন্যে বাস ভরে ছেলেপেলে গেল, সত্যি সত্যি চড়-থাপ্পড়ও দিয়ে আসল! এসব মাইরের আবার ভিডিও পাওয়া যেত। ব্লুটুথ প্রযুক্তিতে এসব ভিডিও এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে যাতায়াত করতে থাকল! কী এক্টা অবস্থা!
সিটি কলেজের সাথে মারামারি, পুলিশ এসে টিয়ারগ্যাস মেরে এলাকা অন্ধকার লরে ফেলল, অসহ্য উত্তেজনা!
এদিকে ক্লাসের অবস্থা আরো ছ্যাড়াব্যাড়া। আমরা সপ্তাহখানেক ঠিকমত ক্লাস করলাম, এরপরে গ্যালারি খালি হওয়া শুরু করল। ক্লাসে না ঢুকলেও আমরা নিয়মিত কলেজে যাই। ক্যান্টিনে বসে খিচুড়ি খাই, এক টাকার লালচা হাতে নিয়ে পুকুরের দিকে তাকায় উদাস হয়ে যাই, আর নাহলে কমন রুমে বসে থাকি। যারা খেলাধুলা পারে,খেলে, আমি আমার মোবাইলের ইনফ্রারেড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন অডিও-ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট সংগ্রহ করি।
সেকেন্ড ইয়ারে অবস্থা এমন দাড়াল, ২১০ জনের ক্লাসে ১০ জন ছাত্র নাই। কোনদিন ৪-৫ জন ছাত্র হলে টিচার্স রুমে গিয়ে স্যার/ম্যাডামকে ডেকে নিয়ে আসা হয়, তিনি ক্লাস নেন।
একদিন আরেক সিন সিনারি হয়ে গেল, আমাদের সামনে ককটেল ফাটায়ে দুই গ্রুপের একটা সিনপাট হয়ে গেল। চোখের সামনে প্রথম কাউকে রামদা দিয়ে দৌড়ানি দিতে এবং খেতে দেখলাম। কলেজে তখন প্রতিদিন কিছু না কিছু হয়ই।
আমার জীবন তখন বিন্দাজ। আমি সকালে উঠে কলেজে যাই, সবার সাথে বসে আড্ডা মারি, খিচুড়ি খাই, চা খাই, ক্লাসের টাইম শেষ হলে নিউমার্কেট যাই, নিলক্ষেত হয়ে বাসায় ফিরি! গার্লফ্রেন্ড ব্যপারটা নতুন চালু হয়েছে, অনেকের নতুন গার্ল্ফ্রেন্ড হয়েছে,তারা সারারাত ফোনে কথা বলে,সেই গল্প শুনেই বাকিরা পুলকিত হই। এক বন্ধু কাউকে জোটাতে না পেরে সবার হাতে পায়ে ধরতে লাগল, তাকে যে কোন ভাবেই হোক একটা মেয়ে যোগাড় করে দিতে হবে। মেয়ে পাওয়া গেল, উদার মনের, সবাইকে টাইম দেয়। বন্ধু অনেক খুশি।
অপেরা মিনি দিয়ে ছবি অফ করে ফেসবুক চালাই সবাই, ইন্টারনেট প্যাকেজ অনেক পরে এসেছে, জ্বি আমরা পে- এজ-ইউ-গো যুগের মানুষ। অপেরা মিনি দিয়ে বাটন ফোন থেকে ফেসবুকে ছবি আপ্লোড দেওয়া যত্রণা, মানুষ সাইবার ক্যাফেতে পেনড্রাইভে ছবি নিয়ে প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করে।
ইনবক্সে যে চ্যাট করা যায়, এই তথ্য আবিষ্কার করে ছেলেরা নিত্যনতুন মেয়েদের ইনবক্সে পাউলি দেওয়া শুরু করল (পাউলি রাফিদের ল্যাংগুয়েজ)।
২০০৮-০৯ সাল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ।সবার মোবাইলে মিনারের গান, ফুয়াদ-মিলা আর নানান পদের গান। এদিকে আমার বন্ধু অভি পারিবারিকভাবে সিনেমার প্রযোজনা ব্যবসার সাথে জড়িত। সে নিয়মিত শাকিব খানের রেট বেড়ে যাওয়া নিয়ে হা-হুতাশ করে। শুনি। কত কিছু জানার আছে!
সকাল শেষ করে দুপুর হলে আমার রুটিন চেঞ্জ হয়। উদ্ভাসে আমি কেমিস্ট্রি আর বায়োলজি ক্লাস করি। ক্লাস করে হেটে হেটে বন্ধুদের সাথে মতিঝিল বাজারের ভেতর দিয়ে হেটে হেটে আইডিয়ালের সামনে এসে রিকশা নেই। উদ্ভাসের ভাইয়ারা ক্লাস নিয়ে কীভাবে কোটি কোটি টাকা কামাই করছে এই আলাপ করে শিহরিত হই। এদিকে আমি বেইলি রোডে "কম্বাইন্ড ব্যাচে" বাংলা পড়তে ভর্তি হয়েছি, টানটান উত্তেজনায় ক্লাস হয়, প্রচুর টেনশন।
যেদিন বিকালে কোচিং বা অন্য কিছু থাকে না, সেদিন আমি আবার আড্ডা দিতে বের হই। আমার বন্ধু রাফিদের বাসা খিলগাও আনসার কোয়ার্টার। আমি রুটিন করে গোরানের বাসা থেকে হেটে হেটে আড্ডা দিতে যাই। কোন কাজে না, যাস্ট আড্ডা মারার জন্যে বের হওয়া যায়,এই কনসেপ্ট আমার জন্যে নতুন। আড্ডা মারতে যাবার জন্য রিকশা ভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আমার নাই, প্রয়োজনও বোধ করি না। খিলগাও তখনো ট্রেন্ডি না, অনেক ফাকা। আমি হেটে হেটে যাই, আমার খুব আনন্দ লাগে। আড্ডা দেওয়ার জন্য যাচ্ছি, এটাই অনেক বড় বিষয়। আমরা খিলগাও এর ভেতরের দিকে হাটি,আমাদের টাকা পয়সা নাই, তবে গল্পের প্রচুর এলিমেন্ট আছে। রাফিদ এনডিসিতে পড়ে,আমি ঢাকা কলেজে, গল্পের অভাব হয়না।
নতুন কম্পিউটার কিনেছি। কোটি কোটি না দেখা মুভি। আমি সব দেখি। পাভেল ভাইয়ার কাছে ইন্টারনেট আছে, পেনড্রাইভ ভরে সিনেমা নিয়ে আসি। এক সিনেমা ১০০ বার দেখি। ডায়লগ সহ মুখস্থ হয়ে যায়। তাও দেখি। মুভি দেখে রাফিদের সাথে লম্বা আলাপ করি। ব্র্যাড পিট আর জর্জ ক্লুনির ভাব দেখে যাস্ট খুন হয়ে যাই আমরা...
মাঝে মাঝে শাহজাহানপুরে বাগিচা ব্রিজের উপর আড্ডা দেই, এই খবর পেয়ে এক বন্ধুর আম্মা বাসায় কমপ্লেন দিলেন, আমরা "ফ্লাইওভারের উপর" আড্ডা দিয়ে বেড়াচ্ছি। উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে আমাদের সকলের ভবিষ্যৎ "ঝরঝরা"।
এসএমএস বান্ডিল প্যাক বিক্রি হত। কিছু ফানি এসএমএস চালু ছিল। সবাই সবাইকে পাঠাত। চ্যাট ব্যপারটা যে এসএমএসে করা যায়,এখন হয়ত অনেকে বিশ্বাস করবে না।
লাভগুরু বলে একটা বিষয় চালু ছিল। প্রতি বিষ্যুতবার রাতে এফএম রেডিওতে একজন মহাজ্ঞ্যানী ব্যক্তি আসতেন, সবাইকে উপযুক্ত নিয়মে এবং কারণে প্রেম না করার জন্য বকাবকি করতেন। বিদিক, একদম বিদিক অবস্থা!
ফিফা আর এনএফএস খেলতাম প্রচুর, জানিনা এখন ছেলেপেলে কী খেলে, আমাকে এরা আংকেল ডাকে, আমার জানার কথাও না...
আজাদ স্যারের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সবার অনেক আবোলতাবোল উত্তরের পরে স্যার নিজেই বলে দিয়েছিলেন, "Happiness lies in contentment".
কারো যদি মনে হয় সে সুখে আছে, তাহলে সে সুখে আছে। আমি জানতাম আমি সুখে আছি।
কলেজে থাকার সময় আমাদের বন্ধু বান্ধবের আড্ডা মারার জায়গা ছিল দুইটা। একটা শাহজাহানপুরের বাগিচা মসজিদের পাশের ব্রিজ, আরেকটা খিলগাঁও পল্লীমা এর সামনে। Zahur এর বাসা পল্লীমার পাশে, আর আমাদের বাকি সবার বাসা থেকে এই জায়গাটা মাঝামাঝি পড়ে। নিরিবিলি এই জায়গাটা আমাদের খুব ভাল্লাগতো। এলাকা ভর্তি বড় বড় গাছ। সবচেয়ে বড় কথা জায়গাটা নিরিবিলি। হাটতে হাটতে খিলগাঁও বয়েজ স্কুলের মধ্যে ঢুকে বসে থাকতাম। গার্লস স্কুলের পাশ দিয়ে ঘুরে আনসার কোয়ার্টারের চারপাশ চক্কর মারতাম। সন্ধ্যা হইলে টুপ করে বাসায় ঢুকতাম।
কলেজ শেষ হইল, ভার্সিটি লাইফ শুরু। Zahur খুলনায় পাড়ি জমাইল। খিলগাঁয়ে যাতায়াত কমল, সে আসলে যাই, নাইলে না। একবার গিয়ে শুনি কি এক কফির দোকান হইছে, খুব ভালো। সবাই খায়। জিজ্ঞেস করার পরে Zahur মুখ বাকায় বলল, "আরে জিয়া মামার দোকান" । খাওয়া হইল না। একসময় আবিষ্কার করলাম পুরা ঢাকা শহরের মানুষ এই কফির দোকানে কফি খায় আর চেক ইন দেয়।
কালে কালে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকায় অনেক পানি প্রবাহিত হল। ঢাকা শহরের মানুষ বড় বড় DSLR ক্যামেরা কিনা শুরু করল। তারও পরে মানুষ বাইসাইকেল কেনা শুরু করল। সেই সাইকেল চালাতে হলে মাথায় হেলমেট, হাতে গ্লাভস এবং জায়গায় জায়গায় প্যাড লাগাতে হয়। চোখের সামনে পল্লীমার দুই মাথায় দুইটা স্পিড ব্রেকার দেয়া হইল,zahur দের গলিতে আখাম্বা সাইজের আরও দুইটা । সেই স্পিড ব্রেকার এমন বিজাত সাইজের, তার উপর দিয়ে রিকশায় পার হইলে গায়ের হাড্ডি গুড্ডি খুলে আসতে চায়। এখন আমি খিলগাঁও গেলে zahur এর বাসার গলিতে ৩০০ স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়ে দেখি। ছেলেরা কেউ ক্যামেরা হাতে থাকে, আর কয়েকজন এক চাকার উপর কায়দা করে সাইকেল চালানোর চেষ্টা করে। যারা ক্যামেরা হাতে থাকে, তাদের অর্ধেক সাথে থাকা মেয়ের ছবি তুলে, আর বাকি অর্ধেক সাইকেল ওয়ালাদের ছবি তুলে। বাকি ছেলেরা, যাদের সাথে ক্যামেরা বা সাইকেল নাই, তারা zahur দের বাড়ির দেয়ালে পিঠ ঠেকায়ে হাতের ব্যায়াম করে।
আর আমার লজ্জা লাগে। স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের সাথে চোখাচোখি হলে আমি লজ্জা পাই, চোখ নামায় নেই......
সব কিছু একদিন বদলায় যায়। আর কৈশোর এর রঙিন সময় পার করে আসা সময়টার কথা মনে করে মনটা অল্প একটু খারাপ হয়।
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০. ঢাকা কলেজে ইন্টারের মডেল টেস্ট চলে।কেমিস্ট্রি পরীক্ষা ছিল। দুপুরের পর পরীক্ষা। শেষ হতে হতে বিকাল ৪-৫ টা। নীলক্ষেত থেকে রিকশা নিলাম আমি, রাকিন আর অয়ন, গন্তব্য টিএসসি। টিএসসি পর্যন্ত আবহাওয়া অতি চমতকার, বইমেলার দিকে ঢুকলাম। আকাশ কালো করে মেঘ করল। বইমেলার গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আকাশ ভেংগে বৃষ্টি, সাথে শিলা। দৌড়ে আশ্রয় নিলাম বর্ধমান হাউজের সামনের বারান্দায়। তিন বন্ধু হুট করে আলাদা গয়ে গেলাম। আলাদা করে বাসায় ফেরার উপায় নেই, ধরা খাব। বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে বাকিদের খুজছি। পকেটে নানুর দেয়া টাকা,সেদিনই নানু বাড়ি গেছে, যাওয়ার আগে হাতে গুজে নিয়ে গেছে দুইশ টাকা.... বৃষ্টি শেষ। তিন বন্ধু এক হয়েছি। দোয়েল চত্ত্বর হয়ে বাসায় ফিরব, হেটে হেটে আগাচ্ছি। বৃষ্টির পরের ঠান্ডা বাতাস, আমরা ইন্টার পরিক্ষার্থী... আহারে জীবন, জলে ভাসা পদ্ম যেমন....
জগতে ফার্স্ট বয়দের একটা আলাদা কদর আছে। অবাক করা মনে হলেও সত্যি, এই পৃথিবীতে আসলে আরও অনেকগুলো ছোট ছোট পৃথিবী আছে। আমরা প্রত্যেকে একটা পৃথিবীতে বাস করি, যেই পৃথিবীতে বাকি সব পৃথিবীত অস্থিত্ব অর্থহীন।
ফার্স্ট বয়ে ছিলাম, পৃথিবীতে চলে গেলাম। আমার একটা পৃথিবী ছিল, আইডিয়াল স্কুল নামে। মতিঝিলে অবস্থিত, ঢাকা-১০০০। পীরজংগি মাজারের পাশে, কৃষ্ণচূড়া গাছের ঠিক পেছনে। এই পৃথীবীতে রাজা-বাদশা ছিল, রাজপুত্র ছিল, আর প্রজা ছিল। আইডিয়ালের ফার্স্ট বয়েরা ছিল এই রাজ্যের রাজপুত্র।
আমি আইডিয়ালে ভর্তি হই ক্লাস সিক্সে। নতুন ছাত্রদের নিয়ে এক শাখা; শাখা-৯। ৫,৬,৭,৮ ছেলেদের শাখা, পুরান ছাত্রদের। আমরা নতুনেরা সবাই এক শাখায়, পুরান কাউকে চিনি না। আমি স্কুলে যাওয়া আসা করি আমার বন্ধুর সাথে, হামজা। সে পুরান ছাত্র, শাখা ৫ এর। তারকাছে বাকি সব শাখার ছেলেদের গল্প শুনি। শিহরিত হই। এত ভাল ছাত্র মানুষ কীভাবে হয়!
সব শাখার ফার্স্ট বয়দের দেখা পাওয়া যায়, নামাজের সময়, ওযুর লাইনে। একজনকে দেখা যায়না, এই ছেলে চুপচাপ। নাম শুনি, দেখি নাই কোনদিন। তবে এই ছেলে নাকি লিজেন্ড, টানা ফার্স্ট হয়।
নাইনে উঠে সব শাখা রি-শাফল করা হল। আমি গেলাম শাখা ৮ এ। আগের সব শাখা মিলিয়ে ঝিলিয়ে সব নতুন শাখা। এই শাখার ফার্স্ট বয় কাকতালীয়ভাবে সেই ফার্স্ট বয়। রাকিন।
রাকিন তার নামের মান রাখল। প্রথম তিনদিন তার দেখা নাই। চতুর্থ দিনে তাকে দেখা গেল। ফুলহাতা একটা শার্ট গুটায়ে কনুইয়ের কাছে নিয়ে খুব অদ্ভুতভাবে টুপি পরা একটা ছেলে। ক্লাস টিচারের কাছে এপ্লিকেশন না কি জমা দিয়ে সে তার বেঞ্চে গিয়ে বসল, ডানে বামে কারো সাথে কথা বলে না। মাথা নিচু করে বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে একটা ছেলে দিন পার করে দেয়, এমন আজব ছেলে আমি জীবনেও দেখিনি। এই ছেলেকে কিছু জিজ্ঞেস করলে এক শব্দে উত্তর দেয়, তারপরে আবার মাথা নিচু করে বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব তাজ্জব ব্যাপার।
আইডিয়ালে রোল অনুযায়ী বসার সিস্টেম ছিল। ক্লাস নাইনের ক্লাসটিচার ছিলেন খুব ভাল মানুষ, স্যার এত কড়াকড়ির মধ্যে না গিয়ে বলে দিলেন, এই রোল থেকে এই রোল এই সারিতে বসবে। আমরা আনন্দিত, যে যার আশেপাশের রোলের বন্ধুর কাছে বসে। জীবন সুন্দর। আমরা প্রচুর বখিলবাজি করে দিন পার করি। খুব সুন্দর সময়, ২০০৬ সাল। ওয়ার্ল্ড কাপ হচ্ছে, গ্যাংস্টার সিনেমা বের হচ্ছে, শাকিরার হিপ্স ডোন্ট লাই বাজছে, অদ্ভুত সময়। রাকিন বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে বছর পার করে দিল।
ক্লাস টেন। সুখের দিন শেষ হয়ে আসে। ক্লাস টিচার কিংবদন্তীতুল্য কড়া মানুষ। দেওয়ান মোহাম্মদ বাকিউল্লাহ স্যার। কড়া আদেশ জারি, সিটিং এরেঞ্জমেন্ট কঠিনভাবে মেইন্টেইন করতে হবে। আমার রোল ৮, রাকিনের ২। আমার সিট রাকিনের সাথে!
শিট।
শিট।
শিট।
পিওর শিট।
আইডিয়ালের শেষ বছর আমি এই ছেলের সাথে বসে পার করতে পারব না। আমি চোখে অন্ধকার দেখছি। আমি আর কিছু না হোক, মানুষজনের সাথে একটু আলাপ-সালাপ করতে ভালবাসি, এই ছেলে বোমা মারলেও কথা বলে না। ক্লাসে বাকিরা আমাকে এক বছরের জন্য বিদায় দিয়ে দিল। বিদায়ের সময় বলল, “যা, রাকিন তোকে এক বছর ঘুম পাড়ায়ে রাখবে।“
আইডিয়ালে বেঞ্চমেট অনেকটা জেলখানার সেলমেটের মত। আমার সেলমেট রাকিন। আমি শেষ। এই ছেলে বেঞ্চের দিকে তাকায়ে বছর পার করে দেয়, পড়া না পারলে যে পাশ থেকে একটু বলে দিবে, এই আশা নাই। আমি বিরস বদনে ক্লাস শুরু করলাম। এরকম লেজেন্ডের পাশে বসার অভ্যাস নাই। নিজেকে ঘাস-লতাপাতা মনে হয়। আমি কিছুই পারি না, এ সব পারে। এই ছেলে ব্রেন শার্প করার জন্য কচি বেলপাতা ঘিয়ে ভেজে খায়। দিন যায়, আমি মন খারাপ করে আশেপাশে দেখি। ক্লাসে প্রচুর বিনোদন, আমার জীবন নীরস। বায়োলজি ক্লাসে পড়া ধরে স্যার শূন্য দিল, আমি মন খারাপ করে রাকিনকে বললাম, “পড়াশুনা করতে হবে”। বদ পোলা খুব ভাব নিয়ে বলল, “তাইলে পড়না কেন?”
আস্তে আস্তে কিছু পরিবর্তন দেখা গেল, টার্ম পরীক্ষার সময় এই ছেলে আমাকে বিশাল সাহায্য করে, পারলে নিজের খাতা খুলে আমাকে দেখায়। প্রি-টেস্টে পাশ নিয়ে টানাটানি, এই ছেলে পাশের সারি থেকে খাতা উচু করে আমাকে দেখায়, আমি দূর থেকে দেখে দেখে লিখি। বেরসিক রাকিন আমার পাল্লায় পড়ে কথা বল শুরু করল, দেখা গেল, ছেলে ভালই কথা জানে, বলে না আরকি। একদিন বলতেছে, “এই ফুয়াদ, মেয়েদের সাথে কথা বলছ কোনদিন?” আমি উত্তর দেওয়ার আগে নিজেই বলল, “ক্লাস ফোরে পড়ার সময় মুক্ত খবরের অডিশন দিতে গেছিলাম, পাশে একটা মেয়ে বসছিল, খুব বিরক্ত করছে”।
টেস্ট শেষ, কোচিং ক্লাস শুরু। এরা ভাল ছাত্র, ১ নম্বর শাখা, আমি কম ভাল ছাত্র, ২ নম্বর শাখা। রাকিনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ। ফোন-মোবাইল কিছুই নাই, যোগাযোগ হবে কীভাবে!
যোগাযোগ আবার এসএসসির পরে। আমি কোথাও চান্স না পেয়ে, নানান ঘাটের পানি খেয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছি। দেখা গেল আমার পুরান সাথীও আমার মত কোথাও চান্স না পেয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি। আমাদের মন খারাপ, মনে আশা ছিল সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে শান্তিনগর হয়ে আরামবাগ যাব, আর সেখানে মাই-লাইন বাসে করে তালতলা মার্কেট থেকে ঢাকা কলেজ যাচ্ছি। আমাদের দেখলে মানুষজন বলে, আসলে গোল্ডেন পাওয়া মানেই তো ভাল ছাত্র না। আমাদের মন আরও খারাপ হয়। এই দঃসময়ে রাকিনের সাথে আবার দেখা। দুইজনেই সি সেকশন, পুরান সাথীকে দেখে আনন্দ পেলাম, সুখ-দুঃখ শেয়ার করি। একসাথে দুঃখের আলাপ করলে একটু কম খারাপ লাগে।
সময় ২০০৮ সাল, তখন ঢাকা কলেজের পুরানো গৌরব অনেকটা মলিন। নানান কথাবার্তা হয়, আমরা মুখ-চোখ শুকনা করে সব শুনি। যারা ঢাকা কলেজে পড়ে, তারা আসলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বাংলাদেশ শাখার শিক্ষানবীস, এমন কথাবার্তা কানে আসে। আন্টি মহলে ফুসফাস, আসল মেধাবীরা সবাই নটরডেমে, বাকি সবাই বাতিল। কষ্ট লাগে। দুই-তিন দফা মারামারি হয়ে গেল, ঢাকা কলেজ থেকে ছেলেপেলে বাস ভরে মারামারি করতে যায়, সাইন্স ল্যাবে ভাংচুর করে, একদিন সিটি কলেজের সাথে মারামারি করতে গিয়ে নিজেরাই মার খেয়ে কাত হয়ে গেল, কলেজে টিয়ারগ্যাস-অন্যরকম উত্তেজনা। পলিটিক্স করে এমন দুই একজন ভাইয়ের নাম কানে আসে, চেহারা দেখি না, নামেই কাম হয়ে যায়, নাম ভাঙ্গায়ে পোলাপান ফাপর নেয়। আমরা ঢাকা কলেজের উল্টা দিক থেকে ২০ টাকা দিয়ে টি-শার্ট কিনি, সেটা পরে ক্লাস করি। উদাস উদাস মুখ করে গেঞ্জি আর জিন্স পরে ক্লাসে যাই, প্রটোকল মেলে এক ক্লাসের পরে পালিয়ে ক্যান্টিন নাহলে কমন রুমে চলে যাই। দুধে মেলামিন পাওয়া গেল, ঢাকা কলেজের ক্যান্টিনে দুধ-চা বন্ধ। ডিসেম্বর মাসের শীতে আমরা ঢাকা কলেজের ক্যান্টিন থেকে এক টাকা কাপ লেবু চা নেই, সেই চা পুকুরপাড়ে বসে খেতে খেতে প্রচুর উদাস হয়ে যাই। ক্লাস শেষ করে নিউমার্কেট নাহলে নীলক্ষেত। নিউ মার্কেটে গেলে আলদা খাতির পাওয়া যায়, ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে। আমরা দুইতলার জিন্সের মার্কেট থেকে ৬০ টাকার টি-শার্ট কিনি, বেশ দামী। নিউ মার্কেটের ফুটপাথ থেকে কালো চাদর কেনার পরে মনে হল, অর্ধেক হিমু হয়ে গেছি, বাকিটা কলেজ শেষ করার আগেই হয়ে যাব।
এর মধ্যে রাকিনের কিছু পরিবর্তন হয়েছে, কিছুটা না, বেশ পরিবর্তন। রাকিন আজকাল বেগুনী একটা শার্ট পরে ঘুরে বেড়ায়। এর মাঝে একদিন আমার সাথে নিউমার্কেট গিয়েছিল। অনেক বেছে একটা সানগ্লাস পছন্দ করে দিয়েছি, সেটা সে সবসময় চোখে পরে থাকে, নাইলে শার্টের বোতামের সাথে ঝুলিয়ে রাখে। আগে কলার বাটন ছাড়া সবগুলা বোতাম লাগানো থাকত, আজকাল উপর থেকে তিনটা বোতাম খোলা থাকে। আমরা যারা প্রতিদিন দেখি, তারা অভ্যস্ত হয়ে গেলাম, বাকি যারা অনেক দিন পর দেখে, বিষম খায়। ফার্স্ট বয় রাকিনকে ঢাকা কলেজের রাকিনের সাথে মেলানো যায়না। আলাপচারিতা বাড়ে, ঢাকা কলেজ কেমন করে ভাল ছেলেদের নষ্ট করছে এর মোক্ষম উদাহরন রাকিন। রাকিনের ফোন আর আমার ফোন একই, Sony Ericsson, W200i. আমরা মোবাইলে গান শুনি, ভিডিও দেখি, আর Asphalt গেম খেলি। রাকিনের ফোন ভর্তি মেটাল গান, ইনিস মনা শোনে, মাথা নাকি একদম নষ্ট নষ্ট লাগে। বড় সুখের সময়।
ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার রেজাল্ট দিল। রাকিন বোটানিতে ফেল। এসএসসির স্কলারশিপের রেজাল্ট দিল। জীবনে কোনদিন বৃত্তি না পাওয়া আমিও বৃত্তি পেলাম, ফার্স্ট বয় রাকিন পেল না। ইয়ার ফাইনালের রেজাল্ট দিল। রাকিন আবার ফেল। সুধীসমাজ নিশ্চিত, ঢাকা কলেজ মানুষ নষ্টের কারখানা।
সমস্যা হচ্ছে, আমি রাকিন একসাথে থাকি সবসময়। রাকিন পড়াশুনা করে কি করে না, সেটা আমি দেখি। রাকিনের খাতা দেখে লিখে আমি নিজে বোটানিতে পাশ করছি, এই ছেলে ফেল করবে, সেটা আমার বিশ্বাস হয়না। রাকিন ফেল করে নাই, সেটা সে নিজেও জানে, কিন্তু এটা নিয়ে তার মাথাব্যথা নাই। ঢাকা কলেজ তখন এক অদ্ভুত কলেজ, ফেল করলেও কেউ কিছু বলে না। রহস্য পরে ভেদ হয়েছিল, আমি আর রাকিন একদিন বোটানি ডিপার্টমেন্টে গেলাম খোঁজ নিতে। কেউ নাই। বাইরে নোটিশ বোর্ডে মার্ক্স টানানো। রাকিনের রোল ৪১০, নম্বর ০। তাজ্জব ব্যপার। মজার ব্যপার হচ্ছে, রোল ৪৯০ হাইয়েস্ট মার্ক। আমরা রোল ৪৯০ কে চিনি, এই ছেলে পরীক্ষা দেয়নাই, সে কেমনে হাইয়েস্ট পায়। ঘটনা বুঝলাম, রাকিন বেশ কায়দা করে ১ লিখত, সেটাকে ৯ মনে করে রোল ৪১০ এর নম্বর ৪৯০ কে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু ৪৯০ পরীক্ষা দেয়নাই, সেহেতু বিষয়টা ধরাও পড়ে নাই। ব্যাপারটা বুঝে দুই বন্ধু খুব একচোট হাসাহাসি হয়ে গেল। ব্যপারটা এখানেই শেষ।
আমরা পড়াশুনা করি। রাকিন পড়াশুনার খোঁজ খবর নেয়। আমার মা সবার মতের বিরুদ্ধে নিজের রিস্কে আমাকে ঢাকা কলেজে ভর্তি করছে, রেজাল্ট খারাপ হলে আমি শেষ। মনে ভয় কাজ করে। আমি কেমিস্ট্রি সেকেন্ড পেপার কিছু পারি না, রাকিন দিনের মধ্যে কয়েকবার করে ফোন করে অদ্ভুত প্রশ্ন করে। “আচ্ছা মামা, বেনজিনকে জারন করেই কি খালি ম্যালেয়িক এনহাইড্রাইড বানানো যায়? আর কোনোভাবে যায় না?” ম্যালেয়িক এনহাইড্রাইড কি জিনিস আমি সেটা জানি না, খুব লজ্জা লাগে, মান সম্মান বাচানোর জন্যে বই খুঁজে কিছু একটা বলার চেষ্টা করি, শুনে রাকিন কি বুঝে সেটা আমি বুঝি না, হ্যা হু করে ফোন রেখে দেয়। কিছুক্ষন পরে ফোন করে বলে, “মামা, হ্যালোজেন বানানোর সময় যে ভ্যানাডিয়াম পেন্টাঅক্সাইড ব্যবহার করে, সেখানে অক্সিজেনের জারন মান কত?” উত্তর পারি না, খুব লজ্জা পাই। লজ্জায় পড়াশুনা করি।
রাকিন বেগুনী শার্ট পরে পড়াশুনা চালায় গেল। ভর্তি পরীক্ষার সময় দুইজন দুইদিকে চলে গেলাম। ও মেডিকেল কোচিং করে , আমি ইঞ্জিনিয়ারিং। খারাপ লাগে, একজন আরেকজনকে সান্ত্বনা দেই, “মামা তুই ঢাকা মেডিকেলে টিকবি, আর আমি বুয়েটে, তাইলে কাছাকাছি থাকা হবে। নাইলে সর্বনাশ”। রাকিন মেডিকেল কোচিং করে, পড়তে পড়তে মাথা গরম হয়ে গেলে মাথা ঠান্ডা করার জন্য, ইঞ্জিনিয়ারিং এর ম্যাথ প্র্যাক্টিস করে। আমি এত তালেবর না, আমি এক ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমার নিজের খবর নাই, পরীক্ষার আগে আমি ঘোষনা দিলাম, রাকিন ডিএমসিতে দশের মধ্যে থাকবে।
মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা আগে, আমি কিছু পারি না। ফর্ম কিনে ফেলছি বলে পরীক্ষা দিতে যাব। আমি খুব চিল মুডে পরীক্ষা দিতে গেলাম। ৭৮ টা এমসিকিউ দাগায়ে বের হলাম। বের হয়ে শুনি কোশ্চেন খারাপ হইছে, আমি টের পাইনাই, কারন আমি কিছু পারি না। রাকিনকে ফোন দিলাম, ৭১ টা দাগাইছে, শিট। আশেপাশে কানাঘুষা, আমার ডিএমসিতে হবে, আর রাকিন ফেল। রেজাল্ট দিল, আমি ফেল, রাকিন ডিএমসিতে। দশের মধ্যে নাই, তবে সেটা স্বাভাবিক, বাজেভাবে প্রশ্নফাস হইছে বলে শুনতে পাচ্ছি, এর মধ্যে টেকাটাই বিশাল ব্যাপার। বন্ধুর গর্বে আমার ছাতি চওড়া হয়ে গেল, নিজে ফেল এটা কোন বিষয় না।
এক সপ্তাহ পরে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা। রাকিনের আম্মা তাকে নিয়ে তার নানাবাড়িতে বেন্ধে রাখল, কারন আন্টির ভয়, পরীক্ষা দিলে ওর বুয়েটেও হবে, আর আমরা কেউ যেহেতু মেডিকেলে নাই, ও একা একা মেডিকেলে না পড়ে বুয়েটে চলে আসবে…
বুয়েটে টিকেছিলাম, পাশাপাশি ক্যাম্পাস। দুই মিনিটের রাস্তা, কিন্তু ছয় মাসে একবার দেখা হয় না। ক্লাসের চাপে আহ্লাদি কথাবার্তা উড়ে গেল, যে যার লাইফ নিয়ে ব্যস্ত। পাঁচ বছরের ক্যাম্পাস লাইফে পাঁচবার দেখা হইছে কি না সন্দেহ, কিন্তু মনে একটা শান্তি ছিল, বন্ধু পাশেই আছে, লাগলে একটা ফোন দিলেই হবে। এই সামান্য চিন্তাটা যে কত স্বস্তিদায়ক, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।
পাঁচ বছর ফাস্ট ফরোয়ার্ড, পাশ করলাম, চাকরি জীবনে অবস্থা আরও খারাপ, আরও কম দেখা হয়, কিন্তু জানি , বন্ধু পাশেই আছে। বাসা পাঁচ মিনিটের রাস্তা। সময়ে অসময়ে কারও শরীর খারাপ হলে কাকে ফোন করব ভাবতে হয় না, জানি রাকিন আছে। দিন রাত যখন হোক, সে ফোন ধরবে।
আরও পাঁচ বছর ফাস্ট ফরোয়ার্ড। এমআরসিএস পার্ট-২ কমপ্লিট করে রাকিন ইংল্যান্ড চলে যাচ্ছে। আমার বড্ড একা একা লাগছে। দেখা হবে বন্ধু…
“It’s been a long day without you, my friend
And I’ll tell you all about it when I see you again”
নিউমার্কেটে গেলে আমার খালি স্টেশনারির দোকানগুলোতে ঘুরতে ইচ্ছা করে, ঘুরে ঘুরে দাগায় দাগায় একটা করে রেডলিফ, ইউনিবল আর পাইলট কলম কিনতে ইচ্ছা করে। বইয়ের দোকানগুলায় ঢুকে হাতে নিয়ে বই উল্টে-পাল্টে দেখতে ইচ্ছা করে। কোনার দোকানগুলার থেকে মোটা কাগজের স্কেচবুক কিনতে ইচ্ছা করে, ইজেল কিনতে ইচ্ছা করে। মসজিদের উল্টাদিকের যেই সিড়িটা দিয়ে দোতলায় ওঠা যায়, যেই সিড়ির গোড়ায় আগে একটা ওয়েট মেশিন ছিল, যেই মেশিনটায় ওজন মাপলে হলুদ একটা কার্ড বের হয়ে এসে ওজন দেখাত, যেই কার্ডের পিছনে একটা রাশিফল লেখা থাকত, সেইখানে দাড়ায়ে ভেলপুরি খাইতে ইচ্ছা করে। ভেলপুরি খেয়ে ঝাল লাগলে মিল্কভিটার প্যাকেটের মত প্যাকেটে যে একটা চকলেট মিল্ক পাওয়া যায়, সেটা খাইতে ইচ্ছা করে। নিউমার্কেটে গেলে আমার নীলক্ষেতে গিয়ে হ্যারি পটার কিনতে ইচ্ছা করে। হ্যারি পটার কেনা হইলে আমার পুরান বইয়ের দোকানগুলা থেকে মাসুদ রানার ফার্স্ট এডিশনের সেকেন্ড হ্যান্ড বইগুলা কিনতে ইচ্ছা করে। নিউ মার্কেটে গেলে আমার আবার ছোট হয়ে যাইতে ইচ্ছা করে...
বুয়েটে পড়ার সময় খুব সকালে ক্লাস না থাকলে বুয়েটের বাসে যাওয়ার কথা ভাবতাম না৷ আর বাড্ডার বাস খিলগাও পর্যন্ত আসতে আসতে সেখানে দাড়ানোর যায়গাও থাকত না৷ ভার্সিটি যাওয়ার খুব কমন একটা মাধ্যম ছিল লেগুনা। খিলগাও রেলগেট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত এক লেগুনায় গিয়ে সেখান থেকে আজিমপুরের আরেক লেগুনা... খিলগাও রেলগেট থেকে গুলিস্তানের লেগুনায় প্রায় সময়ই হেলপার হিসেবে থাকত খুব অল্প বয়সের বাচ্চা ছেলে। এই বাচ্চা ছেলে কীভাবে নিজেকে এই লেগুনার পিছনে ঝুলিয়ে সবার সাথে মত যুদ্ধ করে ভাড়া আদায় করত, সেটা একটা বিষ্ময়। লোকজনও খুব অদ্ভুত। একটু বয়সে বড় হেলপারদের সাথে তারা যেমন তেমন করুক না কেন সেগুলোর সাথে রীতিমতো বাচ্চাগুলোকে রীতিমতো পেয়ে বসত! "ভাড়া একটু পরে নে!" বা "ভাড়া কয় টাকা" এই সংক্রান্ত তর্কযুদ্ধে তারা প্রায়ই বাচ্চাটার সাথে লেগে যেত। এই বাচ্চাগুলোও নাছোড়বান্দা। ঠিকই ঘ্যানঘ্যান করে ভাড়া আদায় করে নিত।
ভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পরে নানা কারনে গুলিস্তানের লেগুনাতে আর কেন যেন ওঠা হয়নি৷ বহুদিন পরে কালকে আবার ওই রুটের লেগুনাতে উঠলাম। বাচ্চা একটা ছেলে হেলপারগিরি করছে৷ বয়স কত হবে? আট-দশ৷ আমার মনে হল গত বহু বছরে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু এই হেলপারদের চেহারা পরিবর্তন হয়নি৷ ময়লা জিন্সের প্যান্ট৷ রোদে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া চেহারা৷ মাথায় পাটের আশের মত চুল। একই ভাষায়, একই নির্লিপ্ততায় সবার সাথে মুলামুলি করে ভাড়া নিচ্ছে, সবাইকে ভাংতি টাকা দিচ্ছে...
পরিস্থিতি খুব অদ্ভুত একটা জিনিস। একই পরিস্থিতি যে কোন মানুষকেই একই ছাচে ফেলে দেয়। মানুষের ব্যক্তিত্ব আসলে মানুষের পরিবেশ পরিস্থিতিরই প্রতিফলন, আর কিছু না...
ঢাকা শহরটা আমার কাছে মাঝে মাঝে স্বপ্নের শহর মনে হয়। খুব আনন্দময় স্বপ্ন- ব্যপারটা এমন না। বেশিরভাগ স্বপ্নে আমরা দর্শকের ভূমিকায় থাকি,আমাদের কথা বলার কোন ক্ষমতা থাকে না। ঢাকার জীবনটাও এমন। পাশের বাড়ির বউ পেটানো লোকের তর্জন-গর্জন আমরা শুনতে পাই, তাদেরকে আমরা কোনদিন চোখে দেখি না। তাদের পরিচিতি বলতে পুরুষ লোকটার গর্জন, আর মহিলাটার চাঁপা সুরে কান্না। কীসের তাদের এত অশান্তি, আমরা জানি না। নিচতলার পিনপিন করে ক্রমাগত কেঁদে যাওয়া বাচ্চাটাকে কোনদিন জিজ্ঞেস করা হয় না, "এই বাবু, তোমার কি খুব ক্ষুধা পেয়েছে?" একটা ট্রলি ব্যাগ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রিকশায় করে আমতলার গলি দিয়ে যেতে থাকা মহিলাটার কী হয়েছে, সেটাও আমাদের জানা হয়না। মহিলার কি কাছের কেউ মারা গেছে? মহিলাকে কি তার বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে? কে বলবে? বছর খানেক আগের কথা। টিউশনি করে টেম্পু করে মালিবাগ থেকে খিলগাও রেইলগেট আসব। একদম কোনার সিটে রিজার্ভ টায়ারের উপর পা তুলে একটা মেয়ে বসা। ২৭-২৮ বছর বয়স হবে। মেয়েটার মুখ আপাতদৃষ্টিতে ভাবলেশহীন, একদৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মেয়েটার চোখ একটু পরপর পানিতে ভরে উঠছে, আর মেয়েটা ওড়নায় আড়াল করে চোখের পানি মুছে ফেলছে। ভাল করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, মেয়েটা প্রানপনে ঠোট কামড়ে কান্নার দমক সামলাচ্ছে। এই মেয়েটার কী হয়েছিল? আমি জানি না। আমার জিজ্ঞেস করা হয়নি। আমরা স্বপ্নদৃশ্যে বাস করি। স্বপ্নে সামনের লোকের সাথে কথা বলা যায় না...
২০১২ সালের কথা। বুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। হ্যারি পটার এন্ড ডেথলি হ্যালোস,পার্ট টু মাত্র বের হইছে। সিনেমা দেখে পরের দিন বা কয়েকদিন পরে নীলক্ষেত থেকে হ্যারি পটারের সবকয়টা বই কিনে নিয়ে এসে পড়া শুরু করলাম। নতুন স্মার্টফোন কিনছি, বাসায় আবার চুরি হয়। আমি রাতের বেলা ফোন সাইলেন্ট করে ড্র্যয়ারে রেখে বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়ি, প্রতিদিন কয়েক পাতা। চার্জার লাইট অন করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়ি। ঘুম না আসা পর্যন্ত পড়ি। সাতটা বই পড়ে শেষ করতে আমার প্রায় সারা বছর লেগে যায়, কিন্তু বহুবছর পরে জীবনের শান্তিময় একটা সময়ের কথা মনে করলে এখনো ওই স্মৃতিই মনে পড়ে।
মন খারাপ হলে আমার এখনো হগওয়ার্টসে চলে যেতে ইচ্ছা করে, গ্রেট লেকের পাড়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে। হ্যাগরিডের কটেজে বসে এককাপ চ খেতে ইচ্ছা করে। ভাই-ব্রাদার নিয়ে হগস্মিডে যেতে ইচ্ছা করে। মিনার্ভা ম্যাকগোনাগালের ক্লাস করতে ইচ্ছা করে।
আকাশ মেঘলা হলে আমার নিউমার্কেটে যেতে ইচ্ছা করে। আর ভরা সন্ধ্যায় ঘর অন্ধকার করে হ্যারি পটার পড়তে ইচ্ছা করে....